শোককে শক্তিতে পরিণত করা নিয়ে কী ভাবলেন

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ফুল দিয়ে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ফুল দিয়ে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এর করুণ ইতিহাস সবারই জানা। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর স্বাধীনতাযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। নির্যাতনের পর তাঁদের হত্যা করে। প্রতি বুদ্ধিজীবী দিবসে আমরা একটি শপথ নিয়ে থাকি শোককে শক্তিতে পরিণত করার। কিন্তু এই শক্তিটি কী? এর রূপ কেমন? এসব নিয়ে যথাযথ ভাবনায় আমরা মগ্ন রয়েছি কি? কী উপায়ে আমরা শোককে প্রকৃতপক্ষে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি আমরা?

শোক থেকে রূপান্তরিত এই শক্তিটি নিশ্চয়ই শারীরিক শক্তি নয়, বরং বুদ্ধির শক্তি। যে বুদ্ধির ভিত্তি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়প্রত্যয়। এই শক্তির অর্জন কতটুকু হয়েছে, তা আমাদের জাতীয়ভাবে সামষ্টিক বুদ্ধিদীপ্ত পথচলার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যা হোক, স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে ৪৮টি শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হয়েছে। এই সময়টি কিন্তু কম নয়, বেশ দীর্ঘ একটি সময়—পাঁচ দশক প্রায়! বলুন তো, এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের দেশে এমন কোনো ‘প্রগতিশীল তরুণ বুদ্ধিজীবী সমাজ’ সৃষ্টি হয়েছে, যাদের কথার ওপর ভিত্তি করে আগামী পাঁচ বছর এ দেশ চলতে পারে? যদি এর উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে আমরা শোককে শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছি। আর যদি এর উত্তর ‘না’ হয়, তবে আমরা শোককে প্রকৃতপক্ষে শক্তিতে পরিণত করতে পারিনি এখনো! মত-ভিন্নমত হতে পারে। তবে আমার মতে, উত্তরটি ‘না’ বোধক। অর্থাৎ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সমসাময়িক যেমন একঝাঁক প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী ছিলেন, ঠিক তেমন কোনো তরুণ বুদ্ধিজীবী সমাজ এ দেশে বোধ হয় সৃষ্টি হয়নি স্বাধীনতার পর। এখনো বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমরা যাঁদের চিনি, তাঁদের প্রায় সবাই একাত্তরের আগে জন্মেছেন। জাতিকে যতটুকু হোক, তাঁরাই পরামর্শ দিচ্ছেন।

রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ১৯৭১ সালের স্মৃতি নিয়ে শিশুদের অঙ্গসজ্জা। ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ
রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ১৯৭১ সালের স্মৃতি নিয়ে শিশুদের অঙ্গসজ্জা। ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন পত্রিকায় যাঁরা লেখালেখি করছেন, তাঁদের মধ্যে ‘দূরদৃষ্টি’সম্পন্ন তরুণ লেখক কজন, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্মোহভাবে এ দেশের মাটি এবং মানুষ নিয়ে প্রগতিশীল ভাবনা ভাবেন? হাতে গোনা কয়েকজন হয়তো পাবেন। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্বে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ঝাঁকে ঝাঁকে তরুণ বুদ্ধিজীবী যেখানে আমাদের দরকার, সেখানে বলতে গেলে তরুণ বুদ্ধিজীবী নেই বললেই চলে। ঝাঁকে ঝাঁকে বুদ্ধিজীবী কেন দরকার, তার কারণগুলো অবশ্য একটু জানা দরকার। কারণ, ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে তুমুল প্রতিযোগিতাপূর্ণ। আর্থসামাজিক এবং নীতি-আদর্শগত লড়াইয়ের পরিধিও ব্যাপক বিস্তারিত। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্র অপরিসীম, যার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে পুরো জাতিকেই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় সমৃদ্ধ হতে হবে। ভবিষ্যৎ পৃথিবী কেমন হবে, এ নিয়ে একটু খোঁজখবর নিলেই জানতে পারবেন, বুঝতে পারবেন উন্নত দেশগুলো এবং আমাদের পার্থক্য কতটুকু! ওই সব কথা থাক, শোক থেকে শক্তি—এই শক্তি কী এবং এর রূপ কী? সহজেই অনুমেয়, এই শক্তি বুদ্ধির শক্তি এবং এর রূপ হবে বহুমাত্রিক।

শোককে শক্তিতে রূপান্তরের যথাযথ ভাবনায় আমরা মগ্ন রয়েছি কি? এই প্রশ্নের উত্তরও অবশ্য ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। তবে বোধ হয় জরিপ করলে ‘না’ জয়যুক্ত হবে! কারণ স্পষ্ট, কীভাবে বাংলাদেশ আগামী দিনে পথ চলবে, এ নিয়ে খুব কমই ভাবি আমরা। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, দেশীয় এবং বৈশ্বিক ভাবনার ক্ষেত্রে আমরা ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি দিনকে দিন। যে কারণেই সৃষ্টি হয়নি বড় কোনো ধরনের তরুণ বুদ্ধিজীবী সমাজ। এই আত্মকেন্দ্রিকতার কারণেই আমরা বিচ্যুত হয়ে পড়েছি শোককে শক্তিতে রূপান্তরের শপথ থেকে। আমরা ভাবছি না আমাদের নতুন কোনো উদ্ভাবন আছে, যার কারণে আমাদের আর্থিক ভিত্তি টেকসই হবে? আমরা ভাবছি না বর্তমান পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো টপকানোর কোনো সৃজনশীল হাতিয়ার আছে আমাদের?

জাতীয় পতাকা হাতে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এক মুক্তিযোদ্ধা। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ
জাতীয় পতাকা হাতে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এক মুক্তিযোদ্ধা। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের পরও আমাদের ভেতরে ক্রোধ জাগছে না; স্বপ্ন সৃষ্টি হচ্ছে না হারানো বুদ্ধিজীবীদের মতো বা তাঁদের চেয়ে বড় বুদ্ধিজীবী সমাজ গড়ে তোলার। তরুণদের আমরা পাঠাগার থেকে পার্কে নিয়ে গিয়েছি। স্বদেশি চেতনা ভুলে দিন দিন বিদেশপ্রেমী হয়েছি, রোধ করতে পারছি না মেধা পাচার। যা হোক, এক কথায় হলো আমরা আমাদের তরুণদের বুদ্ধিজীবীতে রূপান্তরের কার্যক্রমে ভীষণভাবে পিছিয়ে রয়েছি। কী উপায়ে শোককে প্রকৃতপক্ষে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি আমরা? উপায় সহজ! শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের মূল তাৎপর্য তরুণদের মধ্যে তুলে ধরা। অবিরত বুদ্ধির চর্চা, বুদ্ধির বিকাশে সহনশীলতা বাড়িয়ে বিতর্কে উদ্বুদ্ধ করা। পাকিস্তানিরা আমাদের যে ক্ষতি ১৪ ডিসেম্বরে করেছে, ঝাঁকে ঝাঁকে শক্তিশালী তরুণ বুদ্ধিজীবী সৃষ্টি করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাঁকে বাঁকে বিশ্বের মাঝে শ্রেষ্ঠ অবস্থান অর্জন করে তার প্রতিশোধ নেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

সুতরাং, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের ভাবনাজুড়ে থাকা উচিত সামষ্টিকভাবে আমাদের জাতিসত্তা ও স্বকীয়তা বজায় রেখে কীভাবে একটি বুদ্ধিদীপ্ত সমাজব্যবস্থা সৃষ্টি করা যায়, তার বাস্তব ভাবনা এবং এই ভাবনা ব্যক্তিগত পর্যায়কে অতিক্রম করে সামগ্রিক ভাবনায় রূপান্তর করা। অর্থাৎ শোককে শক্তিতে রূপান্তর মূলত জাতিগতভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। এটাই মূলত শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের শপথ রক্ষা করার উত্তম পথ।

*সাকিব জামাল: ব্যাংকার

আরও পড়ুন: