করোনায় ট্রেনে একদিন
‘ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে, রাত দুপুরে অই। ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে। ট্রেনের বাড়ি কই? একটু জিরোয়, ফের ছুটে যায়, মাঠ পেরোলেই বন। পুলের ওপর বাজনা বাজে, ঝন ঝনাঝন ঝন।’
গ্লাস লাগানো জানালার পাশে বসে কবি শামসুর রাহমান রচিত পঙক্তিগুলোর কথা ভাবছিলাম। কবির অঙ্কিত চরণের সঙ্গে তাল মিলিয়েই যেন ছুটে চলছে গাড়ি। ক্রমাগত অতিক্রম করছে সবুজ মাঠ আর চিরাচরিত গ্রামবাংলা। সেই সঙ্গে স্বাগত জানাচ্ছে ইট-কাঠের তৈরি রঙিন দালানকে। পড়ন্ত বিকেলের লাল সূর্যটাও জানালা ভেদ করে ঢুকে পড়েছে চলন্ত গাড়িতে। হঠাৎ বড় কোনো গাছের আড়ালে তার হারিয়ে যাওয়া, অতঃপর আবার ফিরে আসা। এ যেন সূর্য আর সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে ট্রেনের ত্রিমুখী লুকোচুরি খেলা। প্রকৃতির এই লুকোচুরিতে চির ধরিয়ে হঠাৎ বেজে ওঠে বিশাল হুইসেলের শব্দ।
ট্রেন এবার স্টেশনে। বাইরে তাকাতেই নজর পড়ল মোটা অক্ষরের ‘ময়মনসিংহ জংশন’ লেখাটির ওপর। লেখাটি চোখে পড়ামাত্রই হৃদয়কোণে কিঞ্চিৎ ভীতি চলে আসে। মনে পড়ে গেল কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। সেদিন আমার মতো অনেকেই প্রচণ্ড ভিড়ের কবলে পড়ে খালি পকেট আর ফাঁকা হাতে গন্তব্যে ফিরেছিল।
কিন্তু সেদিনের মতো ভিড় আজ আর নেই। নেই কোনো হইহুল্লোড়। ভিক্ষুকও নেই, নেই কোনো হকার, দেখা মিলল না পানি বিক্রেতা কোনো বাচ্চারও। পুরো প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। বন্ধ হয়ে গেছে সব ধরনের গতিশীল ব্যবসা। জানি না করোনার এই ভয়াল গ্রাসে কীভাবে তারা জীবিকা নির্বাহ করছে। আজ যদিও আমার পকেট খালি আর হাত ফাঁকা হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই কিন্তু ওই সব খেটে খাওয়া মানুষের পেটে হয়তো এখন চিতার আগুন জ্বলছে। প্রকৃতি সত্যিই রহস্যময়—একদিকে কমেছে পকেটমার আর অপরদিকে বেড়েছে হাহাকার।
লক্ষ করলাম, গুটি কয়েক যাত্রী ট্রেন থামামাত্রই এগিয়ে আসছে। কারও মধ্যে নেই অস্থিরতা, নেই কোনো তড়িঘড়ি, দূরত্ব মেনেই উঠছে গাড়িতে। আবার অনেককে দেখে মনে হচ্ছে, এই মাত্র হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে আসছেন। যদিও তাঁদের কেউ চিকিৎসক নন। শুধু ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচার জন্যই পদ্ধতিটা বেছে নিয়েছেন। কিন্তু ডাক্তারি ভাষ্যমতে এর আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি না, সেটাই প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার।
এরই মধ্যে চোখ পড়ে গেল স্টেশনের প্রধান ফটকে। এক হাতে পাটের বস্তা অন্য হাতে একটি বাচ্চা নিয়ে মধ্যবয়সী এক মহিলার দৌড়ে স্টেশনে প্রবেশের চেষ্টা। দারোয়ানও দ্রুত উঠে গেট আটকে দিল। মহিলা এবার বাচ্চাটা নিচে রেখে গেট ধাক্কাতে শুরু করল। অতঃপর দারোয়ান তাকে সহজভাবে বুঝিয়ে, শরীরের তাপ মেপে নিয়ে হাতে স্যানিটাইজার লাগিয়ে দিল। ততক্ষণে ট্রেনের দ্বিতীয় হুইসেলও পড়ে গেছে। মাত্র চলতে শুরু করেছে। ভাবলাম মহিলাটা বাচ্চা আর বস্তা নিয়ে উঠতে পারবেন কি না। কিন্তু মহিলার অস্থিরতা আর ঘর্মাক্ত মুখ প্রমাণ দিল যে তিনি পারবেন এবং পেরেছেনও। আর এরই মধ্যে কামরায় থাকা বাকি ফাঁকা সিটগুলোও পূরণ হয়ে যায়।
আমার সিট কামরার শেষ দিকে, ডান পাশে, জানালার সঙ্গে। পাশের সিট ফাঁকা। আমার সোজাসুজি বাঁ পাশের জানালার সঙ্গে থাকা ফাঁকা সিটে এসে বসলেন এক ভদ্রলোক। চেহারায় বৃদ্ধের ছাপ। মুখে ক্লিন শেভ, দাড়ির ছিটেফোঁটাও নেই। টাকওয়ালা মাথার দুই পাশে কিছু পাকা চুল। চেহারায় এখনো সুদর্শনের চিহ্ন লক্ষণীয়। হাতে ল্যাপটপ ব্যাগ। পরনে ঢিলেঢালা প্যান্ট–শার্ট। তারও পাশের সিট ফাঁকা। অর্থাৎ প্রতি দুই সিটে একজন যাত্রী। ভাড়া একজনেরই। ততক্ষণে ট্রেন প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করে দুরন্ত গতিতে চলতে শুরু করেছে।
পকেট থেকে ইয়ারফোন বের করে দুই মাথা কানে দিতেই বেজে উঠল হুমায়ুন আহম্মেদের ‘দুই দুয়ারী’ সিনেমার ‘সোহাগপুর গ্রামে একটা মায়া দিঘি ছিল...’ গানটি। গানের চিত্রটি ছিল এ রকম: ‘অসুস্থ মাহফুজ শাওনের প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ট্রেনে করে শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরছেন। জানালার পাশে বসে মধুর মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণা করছেন আর ঘন ঘন কাশি দিচ্ছেন।’ এটি মনে হওয়ার পর নিজের মাঝেও কিছুটা আবেগ চলে আসল। যদিও প্রেক্ষাপট ভিন্ন কিন্তু বাহন তো এক। চাইলাম রিলাক্স মোডে থাকতে কিন্তু সে আর হলো না। আবেগে মন তখন টইটম্বুর। মনে পড়ছিল প্রায় তিন মাস অতিবাহিত গ্রামীণ জীবনের কথা। দীর্ঘদিন পর নিজ জন্মভূমিতে পদার্পণের অনুভূতি। আরও কতশত স্মৃতি। নদীতে গোসল করে জ্বর-ঠান্ডা বাধানো। আবার সাঁতার কেটে নদী পার হওয়ার সময় ক্লান্ত হয়ে চোখ অন্ধকার হয়ে যাওয়া, অতঃপর নৌকায় করে উদ্ধার। সঙ্গে সঙ্গে গুজবের ন্যায় পুরো গ্রামে সে খবর ছড়িয়ে পড়া। এ ছাড়া মনে পড়ছিল প্রিয় মানুষদের কথা। ছোট ভাইবোন আর বড় আপুর স্নেহের কথা। ট্রেন এদিকে যেন তার ছন্দ খুঁজে পেয়েছে। দুরন্ত গতিতে গন্তব্যের দিকে ছুটছে। ট্রেনের এই দুরন্ত গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই যেন আমার মন খারাপের পরিধিটা ভারী হতে লাগল। ইয়ারফোন খুলে অপলক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে চলন্ত ট্রেনের মিতালি আবার উপভোগ করতে শুরু করলাম।
পুরো ট্রেনে তখন সুনসান নীরবতা, শুধু ঝক ঝকাঝক শব্দটাই স্পষ্ট। সব নীরবতা ভেঙে হঠাৎ এক নারীকণ্ঠের আওয়াজ। বাঁয়ে তাকাতেই দেখি সেই তেজস্বিনী মধ্যবয়সী মহিলা। মহিলা টিকিট বের করে প্রশ্ন করলেন, আমি কোনো কথা না বলে হাতের ইশারায় সিটটা দেখিয়ে দিলাম। মহিলা বৃদ্ধ ভদ্রলোকটির কাছে গিয়ে বললেন, এই যে ভাই, সিটটা আমার। ভদ্রলোক জীজ্ঞাসু ভঙ্গিতে বললেন, জি? মহিলা এবার কণ্ঠ পরিবর্তন করে উচ্চস্বরে বললেন, আরে ভাই উঠেন ত। এটা আমার সিট, এই দেখেন টিকিট। ভদ্রলোক টিকিট হাতে নিয়ে দেখলেন, তিনি যে সিটে বসে আছেন, মহিলার টিকিট সাক্ষ্য দিচ্ছে সেটি মহিলারই। ভদ্রলোক আশ্চর্য হয়ে ব্যাগ থেকে তাঁর টিকিটও বের করলেন। বের করে তিনি একেবারে হতবম্ভ হয়ে গেলেন। কারণ সিট একটা কিন্তু টিকিট দুইটা। দুইটাই ছিল ফটোকপি। ভদ্রলোক বললেন, আমি এখন উঠতে পারব না। টিকিট মাস্টার আসুক, একটা ব্যবস্থা হবে। মহিলাও কি কম নাকি। তিনিও ভীষণ হইচই শুরু করে দিলেন। এক্কেবারে হুলুস্থুল কাণ্ড। এরই মধ্যে চলে আসেন টিকিট মাস্টার। এসে দুজনের ঘটনায় শুনলেন। শুনার পর কোনো সিদ্ধান্ত না দিতে পেরে, ঝাড়ির সুরে বললেন, ‘আপনাদের দুজনকেই পুলিশে দেওয়া উচিত। ব্লাকে টিকিট কিনছেন কেন? কথাও ঠিক। তাঁরা দুজনেই ৩৮০ টাকার টিকিট ৬৫০ টাকা দিয়ে কিনছেন। অতঃপর পরিস্থিতি সামাল না দিতে পেরে ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। ওঠামাত্রই মহিলা তাঁর সন্তান নিয়ে ধপাস করে বসে পড়লেন।
টিকিট মাস্টার কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়েই কামরা ত্যাগ করলেন। সেই সঙ্গে আমারও মনে ভয় ঢুকে গেল যে আবার কে এসে বলে যেন ভাইয়া! প্লিজ উঠেন, এটা আমার সিট। খারাপ নফসের এ সাঁড়াশি আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ভালো নফস বলে দিল, ভয় নেই, এখন সম্পূর্ণই ই-টিকিটিং আর সেটা তুমি নিজেই করেছ, যার পিডিএফও তোমার কাছে আছে। কিন্তু খারাপ নফসের এ আক্রমণ যেন শেষই হচ্ছে না। ডান–বাম সব দিক থেকে আক্রমণ।
ভদ্রলোক হঠাৎ চিন্তার রাজ্যে বিজলি দিয়ে আক্ষেপের সুরে বলতে লাগলেন, দেশটা দুর্নীতিতে ভরে গেছে। সব জায়গায় দুর্নীতি আর অন্যায়। ন্যায়বিচার এখন শুধু ডিকশিনারির শব্দ। ভদ্রলোক আরও বললেন, জীবনে অনেক কালোবাজারি দেখেছি, কিন্তু এ রকম কালোবাজারি কখনো দেখিনি। এক টিকিট দুজনের কাছে বিক্রি করা। মনে হলো লোকটা সত্যিই অনেক কষ্ট পেয়েছেন। চড়া দামে টিকিট কিনেও নিজের সিটে বসতে পারেননি। যদিও ব্ল্যাকে কিনেছেন। আমি প্রত্যুত্তরে বললাম, আমরা যারা সৎ আর সাধু বলে নিজেকে দাবি করি, তারাই দুর্নীতিকে উসকে দিচ্ছি। সমাজভাঙন ও বিকৃতির দ্বায় কেবল অসৎ লোকের না। কিছু সৎ লোককেও এ ভাঙন আর বিকৃতির দ্বায় নিতে হবে। ভদ্রলোক করুন সুরে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও কি মানুষের নৈতিকতা ঠিক হবে না! অন্তর পরিশুদ্ধ হবে না!
ভদ্রলোকের চোখে তখন হতাশার ছাপ। হয়তো সারা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন সরকারি কোনো অফিসে। হয়তোবা চেয়েছিলেন শেষ বয়সটা শান্তির পৃথিবীতে কাটাতে। কিন্তু সে পৃথিবী তৈরিতে তাঁর ভূমিকা কতটুকু ছিল, তার প্রমাণ মেয়ের বয়সী মহিলার ব্যবহার থেকেই বুঝতে পেরেছেন। অতঃপর তাঁকে পাশের ফাঁকা সিটে বসার অনুরোধ করেন, জানালা দিয়ে অস্তমিত লাল সূর্যের দৌড়ের প্রতিযোগিতা দেখতে লাগলাম।
প্রতিযোগিতার একপর্যায়ে তা ঢলে পরে। ঝক ঝকাঝক শব্দকে উপেক্ষা করে ভেসে আসে মুয়াজ্জিনের সুর। আযানের মধুর সুরে প্রকৃতির সবুজ রংও ধীরে ধীরে অন্ধকারে ছেয়ে যায়। কামরায় জ্বলে ওঠে বৈদ্যুতিক আলো। সংক্ষেপে সেরে নিই স্রষ্টার আদেশ। জানালার বাইরের অন্ধকার, পাশের সিটে বসা ভদ্রলোকের অসহায়ত্ব, প্ল্যাটফর্মের নিস্তব্ধতা, ফেলে আসা গ্রামে কাটানো সময় আর মহামারির করাল গ্রাসে পতিত অসহায় মানুষের আর্তচিৎকার, এ রকম হাজারো চিন্তা জালের মতো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে মস্তিষ্কে চেপে বসতে লাগল, বিরহের পরিধি ক্রমাগতই বাড়তে থাকল। সত্যিই করোনার এই ভয়াল থাবা মানুষের জীবনকে করেছে কত বিচিত্র, করেছে কতটা অসহায়। যেন প্রকৃতিদের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। এসব ভাবতেই গায়ে চলে আসে শীতের শিহরণ। কামরার কৃত্তিম ঠান্ডা বাতাস সেই শিহরণে যেন বরফ ঢেলে দিচ্ছে। শরীর এবার সত্যিই শীতল হয়ে গেছে। চোখ বন্ধ করতেই চিন্তার সব জাল ফুটো করে কানের কাছে বাজতে লাগল কবির সেই চরণগুলো...ঝক ঝকাঝক, ঝক ঝকাঝক, ঝক ঝকাঝক।
স্বপ্নের জালে চিড় ধরিয়ে হঠাৎ বিশাল হুইসেলের শব্দ। চোখ কচলাতে কচলাতে বাইরে তাকাতেই দেখি পৌঁছি গেছি ট্রেনের বাড়ি। এত দ্রুত পৌঁছে যাব ভাবতেই পারিনি। অতঃপর নিজের মালপত্র গুছিয়ে নেমে পড়লাম প্ল্যাটফর্মে। এবার আপন গন্তব্যে পৌঁছার পালা। চলে এলাম সোডিয়ামের আলোয় আলোকিত পিচঢালা রাস্তায়। ব্যস্ত রাস্তা তখন কেবল স্বস্তি পেতে শুরু করেছে। কমে গেছে কোলাহল। বেড়ে গেছে স্থবিরতা। আর স্থবির রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে আছি একটি রিকশার অপেক্ষায়।
লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।