লাইব্রেরি যেন বিসিএস আঁতুড়ঘর

বাংলাদেশের তরুণেরা চাকরির ক্ষেত্রে বেশির ভাগ বিসিএস–নির্ভর। সম্প্রতি ৩৮তম বিসিএসের ফলাফল নিয়ে গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মাতামাতি দেখলে তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। তবে বিসিএস একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল। বিসিএসে সফল হতে হলে প্রতি প্রার্থীর গড়ে দুই থেকে আড়াই বছর লেগে যায়। আর এই প্রস্তুতি নেওয়ার সুবিধার্থে অনেকেই সারা বছর ধরে লাইব্রেরি ব্যবহার করে থাকেন। বিসিএস প্রার্থীরা লাইব্রেরির বই ব্যবহার না করে প্রত্যেকেই ব্যবহার করে কিছু সুনির্দিষ্ট চাকরির বই, যা লাইব্রেরির চরিত্রবিরোধী। ফলে লাইব্রেরি তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে হয়ে উঠছে বিসিএস লাইব্রেরি।

প্রকৃত অর্থে লাইব্রেরি হলো বই, পুস্তিকা ও অন্য তথ্যসামগ্রীর একটি সংগ্রহশালা যেখানে পাঠক গ্রন্থপাঠ, গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান করেন। শিক্ষার্থী ও পাঠক অনুসন্ধিৎসু হয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ জ্ঞান লাভের আশায় লাইব্রেরিমুখী হয়। এ জন্যই লাইব্রেরি ব্যবহারে উৎসাহ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ বিদ্বানেরা। তবে অনুসন্ধিৎসু হয়ে লাইব্রেরিতে যাওয়া এখন ইতিহাসের অংশ বলা চলে।

বর্তমানে লাইব্রেরিগুলো বিসিএস–প্রত্যাশীদের দখলে। আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলো দেখেন, দেখবেন ওখানে বিসিএসের পড়ালেখা চলছে! যদি গণলাইব্রেরিগুলো দেখেন, দেখবেন সেখানে বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। মোটকথা দেশের সব লাইব্রেরি এখন বিসিএস লাইব্রেরি হয়ে গেছে অথবা হয়ে যাচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘লাইব্রেরির মুখ্য কর্তব্য হচ্ছে বইয়ের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।’ কিন্তু আজকাল পাঠকেরাই লাইব্রেরির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বিসিএসের বিভিন্ন বইকে!

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

পাঠকেরা ব্যস্ত বিভিন্ন সিরিজের বই মুখস্থ করতে। হাতে-বগলে-ব্যাগে করে বিভিন্ন চাকরি লাভের সহজ উপায় হিসেবে ব্যবহৃত সংক্ষিপ্ত আকারের বই নিয়ে লাইব্রেরিতে আসেন তাঁরা। দিনভর অধ্যয়ন শেষে চলে যান। শিক্ষার্থী যাঁরা আসেন, তাঁদের অনেকের কাছে থাকে সুনির্দিষ্ট পাঠ্যবই। লাইব্রেরিতে থাকা বইয়ের ব্যবহার তাই নেই বললেই চলে। সময় নেই তাঁদের আলমারিতে রাখা বইয়ের দিকে নজর দেওয়ার। তাই ধুলার স্তূপ জমছে লাইব্রেরির তাকে থাকা হাজার বছরের ইতিহাসে।

আমি মোটেই বিসিএস–প্রত্যাশীদের বিরোধী নই বা বিসিএস–বিরোধী নই। তবে লাইব্রেরির নিজস্বতা ধ্বংস করে বিসিএস চাই না।

অর্থনৈতিক সূচকে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে বিপরীতে সামাজিক সূচকে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য হাল ধরতে হবে শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীর। তাদের লাইব্রেরির নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করতে হবে। হতে হবে সত্যিকারের পাঠক। অনুসন্ধিৎসু হয়ে ফিরতে হবে লাইব্রেরিতে।

*শিক্ষার্থী: গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়