নিউইয়র্কের সবুজ বরণ

কয়েকদিন আগে এক বিকেলে ফরেস্ট হিল-সংলগ্ন ফরেস্ট পার্কে হাঁটছিলেন ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। পার্কের প্রবেশ পথে এসে থমকে দাঁড়িয়ে একটি গাছের দিকে অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে থাকলেন। কী দেখছেন, জিজ্ঞাসা করতেই মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘গাছের ডালে নতুন পাতা গজানোর দৃশ্য দেখছি।’
মধ্যবয়সী ওই ব্যক্তির নাম মাইকেল বরাক। পাশের ফরেস্ট হিলের অভিজাত এলাকায় বসবাস তাঁর। জানালেন, তিনি বছরে দুবার নিয়ম করে প্রকৃতি দেখতে বের হন; শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরুতে। শীতের শুরুতে যখন গাছপালার সব পাতা ঝরতে শুরু করে, তার আগে লাল-হলুদের সমারোহে দারুণ এক সৌন্দর্যে সাজে গাছপালা। আবার, দীর্ঘ শীতের পর এখন নতুন করে গাছে পাতা আসতে শুরু করেছে, এই দৃশ্যও অপরূপ। দুটোর অনুভূতিই একই।
‘আমি মাঝে মাঝে এখানে দাঁড়িয়ে থাকি। কয়েকদিন পরে তো সবই সবুজ হয়ে যাবে। কিন্তু এখনই আসল সময়। কারণ, বিবর্ণ গাছগুলোতে নতুন করে সবুজ আসতে শুরু করেছে। ঠিক যেমন জরা আর হতাশার অন্ধকার কেটে জীবনে আসে নতুন উদ্যম। এই দৃশ্য শুধু আমেরিকায় দেখা যায় বৈকি’, বলছিলেন মাইকেল বরাক।
শুধু বরাক নন, এমন আরও অন্তত ১৫ জনের দেখা মিলল, যারা গত ছয় মাস এই পার্কে ঢোকেননি, তাঁরা সবাই আবার সবুজের আগমনে পার্কে আসতে শুরু করেছেন। কয়েকদিন বাদেই পাখি ডাকবে। তীব্র গরমে শান্তির বাতাস ছড়াবে গাছ; এই আগমনীকেই যেন বরণ করতে আসছেন তাঁরা।
বরাকের কথা ধরলে প্রকৃতির এমন পালাবদল কী আর কোথাও এতটা প্রকাশ্যে অবলোকন করা যায়? বাংলাদেশে শীতে কিছু গাছের পাতা ঝরে যায় সত্য; কিন্তু একেবারে ন্যাড়া কী হয় কখনো? সেখানে প্রকৃতির আপন নিয়মে গাছে গাছে পাতার রূপ বদলায়। কিন্তু একসঙ্গে একেবারে বিবর্ণ থেকে সবুজ হয়ে ওঠার প্রত্যাবর্তনটা কী চোখে পড়ে? মনে হয় না। যদিও গ্রীষ্মে বাংলার রূপ হয়ে ওঠে একেবারে ঝকঝকে; সবুজ জমিনের মতো। কিন্তু এই আমেরিকায়, প্রকৃতির নতুনভাবে সাজার ঘটনা একেবারে প্রকাশ্যেই ঘটে বছরের এই সময়টায়।
মানুষ যেহেতু প্রকৃতির অংশ, তাই প্রকৃতির এই পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষেরও কর্মচাঞ্চল্যে বদল ঘটে। ম্যানহাটনের ৮ স্ট্রিটে একটি গিফট শপ পরিচালনা করেন এক বাংলাদেশি নারী উদ্যোক্তা। তিনি তাঁর দোকানে নতুন করে কয়েক লাখ ডলারের পণ্য তুলেছেন, প্রায় ৪/৫ মাসের বিরতি দিয়ে। এত বড় বিনিয়োগ এক সঙ্গে কেন, জানতে চাইলে উত্তরে হাসলেন তিনি।
‘দেখুন, গত ৪/৫ মাস বসে বসে খেয়েছি। শীতে এই শহরে মানুষের আনাগোনা কমে যায়। এখন আবার গ্রীষ্মের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আনাগোনাও বাড়বে। পর্যটকেরা আসবেন বিশ্বের নানান দেশ থেকে। অন্য রাজ্য থেকেও মানুষ নিউইয়র্ককে দেখতে আসবে। যত মানুষ, তত বেচা-বিক্রি। এটা তো মাত্র শুরু। এই মৌসুমে যা বিক্রি করব, সেটা দিয়ে শীতে শুয়ে-বসে কাটাতে হবে আবার। এটা আমাদের জন্য ভালো একটি সময়’, বলছিলেন খুশবু হক নামের ওই নারী উদ্যোক্তা।
সত্যিই এ এক আজব প্রত্যাবর্তন। প্রকৃতির সবুজ আসার দৃশ্যটা যেমন ফ্রেমে বন্দী রেখে প্রত্যক্ষ করা যায়, তেমনি এই সময়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া কর্মচাঞ্চল্যও সহজেই আলাদা করা যায়। উত্তর আমেরিকার অনেক রাজ্য ও কানাডাজুড়ে প্রকৃতির এই সবুজ বরণের সঙ্গে মানুষের কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি অনন্য, যা বাংলাদেশি জীবনে দেখার সুযোগ হয় না।
এ কারণে, গ্রীষ্মকাল তথা সবুজকে বরণ করে নিতে আলাদা প্রতীক্ষা থাকে এখানকার মানুষের মধ্যে। এরই মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীরা নিজেদের সমিতির পিকনিক করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ছোট বড় প্রায় তিন শতাধিক সমিতি আছে এখানে। আর অনিবন্ধিত সমিতি বা গ্রুপের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে এসব সমিতি আর সংঘের কার্যক্রম বন্দী ছিল হোটেল-রেস্তোরাঁ, আর চায়ের কাপের আড্ডায়। এখন তারা দিনক্ষণ ঠিক করে, বাইরে বনভোজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই বের হয়ে পড়ার তাড়াটা থাকবে আগামী আরও ছয় মাস, আসছে শীতের আগ পর্যন্ত। তখন শুররু হবে আরেক প্রতীক্ষার। সে প্রতীক্ষা সবুজকে বিদায় দিয়ে শুভ্র তুষারের আগমনীর।