নজরুলপ্রেমী ডা. তাজিন নোমান

‘আবার ভালোবাসার সাধ জাগে’, ‘আজকে না হয় একটি কথা কইলে আবার মোর সাথে’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানি দেব খোঁপায় তারার ফুল’—পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোটি নজরুলপ্রেমীর সকাল শুরু হয় আলতো হাতে হারমোনিয়ামের ঝংকারে নজরুলের প্রেমের গানে। ঠিক তেমনি প্রতিদিন যাঁর সকাল শুরু হয় চিত্রকল্পের সম্রাট প্রেমের কবি নজরুলের গান দিয়ে, তিনি হলেন ডা. তাজিন নোমান।
আমেরিকার মাটিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিবিড় পড়ালেখার পাশাপাশি সংগীতচর্চায় এতটুকু ভাটা পড়েনি যাঁর—যেখানে গানের আসর, সেখানে ছুটে যান তাজিন। আরকানসাস রাজ্যের লিটল রক শহর থেকে উচিটা বাঙালি কমিউনিটির নিমন্ত্রণে বৈশাখী মেলায় এসে উত্তর আমেরিকা প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘সংগীত মনোযোগে জীবনের স্বর্ণালি দিনগুলো কেটেছে। চট্টগ্রামের শান্ত-নিবিড় ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশে আমার বিদ্যালয় ডা. খাস্তগীর স্কুল। মনে পড়ে, চট্টগ্রামের বনেদি সংগীত বিদ্যালয় ‘আয সংগীত’ এর অধ্যক্ষ প্রয়াত ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়ার কথা। গান শেখার ক খ পাঠ যার কাছে হাতেখড়ি। পরে ওস্তাদ এয়াকুব আলী খানের (বিএএফএ) কাছে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই থেকে এখনো প্রতিদিন শিখছি। প্রবাসজীবনে হাজারো ব্যস্ততার মাঝে প্রতিদিন ভোরের আলোয় দরাজ কণ্ঠে রেওয়াজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
তাজিন জানান, স্কুলে পড়া অবস্থায় ১৯৯০ সালে তিনি জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় (নজরুলসংগীত) রানারআপ হয়েছেন। দারুণ আনন্দে কেটেছে তাঁর স্কুলজীবন। তারপর কলেজজীবন কেটেছে রাজধানী ঢাকার হলি ক্রস কলেজ। একদিকে পড়ালেখার চাপ অন্যদিকে সংগীতচর্চা, এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ। সংগীতাঙ্গন চষে বেড়ানোর অপার সুযোগে নিজেকে জাতীয় পর্যায়ে নেওয়ার প্রথম ধাপে আন্তমেডিকেল কলেজ সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা-১৯৯৬-এ রানারআপ (নজরুল ২য় ও দেশাত্মবোধক ১ম) হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। এই যে শুরু, আর পেছনে তাকাননি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে নজরুলসংগীত ও আধুনিক গান গাওয়ার ডাক পান। নিয়মিত গানের সুবাদে বিটিভিতে জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের বিচারে এ গ্রেড শিল্পী হিসেবে স্থান পান। এ ছাড়া তিনি চ্যানেল আই, এনটিভি, এটিএনে বেশ কিছু গান পরিবেশন করেছেন। ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক নজরুলসংগীত সম্মেলনে গান পরিবেশনের যোগ্যতা অর্জন করেন। যেকোনো গান গাওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য নেই তাঁর। এক-দুই-তিন করে টানা গান গাইতে পারেন। তাঁর সুরেলা কণ্ঠে নজরুল, রবীন্দ্র ও আধুনিক গান দর্শককে বিমোহিত করে। নজরুলসংগীতশিল্পী পরিষদের আজীবন সদস্য লাভের পর কলকাতা আইসিসিআর-এসআরএ সংগীত রিসার্চ একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ওস্তাদ মশকুর আলী খান পরিচালিত উচ্চাঙ্গসংগীতে অংশ নেন তিনি। ২০১২ সালে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি।
তাজিন আরও জানান, স্বামী ডা. মো. সাদিকুল হক আরকানসাস মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইলোমা ইনস্টিটিউট মেডিসিন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। দুই সন্তান শিমাজ ও মানহাকে নিয়ে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন তাঁর। চিকিৎসা আর সংগীত দুয়ের সমন্বয়ে গড়া জীবনে অধ্যয়ন, গান শেখা ও বই পড়া নিয়ে বেশ ভালোই কাটছে সময়।