ঘরের বাইরে কাজে পিছিয়ে বাংলাদেশি নারীরা
আমেরিকায় এখন কর্মহীন মানুষ নেই বললেই চলে। সবাই কিছু না কিছু কাজ করছেন। গড়ে মাত্র ৪ জন কাজ করেন না অথবা কাজ পাচ্ছেন না। এই চিত্র ১৬ বছরের ওপরে সব নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা দেশের পরিসংখ্যান নিয়ে তথ্য উপাত্ত দেওয়া প্রতিষ্ঠান স্টাটিকা ডট কম-এর এক জরিপে দেখা যাচ্ছে ২০১৮ সালের মার্চে এ দেশে কর্মহীন নারীর সংখ্যা মাত্র ৩ দশমিক ৮ ভাগ। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, বাকি ৯৬ জন নারী কাজ করছেন।
অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে এই কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১০ শতাংশ হয়েছিল। ২০১২ সালে এসে সেটি ৭ শতাংশে নেমে যায়। এরপর ধীরে ধীরে এই কর্মহীন মানুষের সংখ্যা প্রতি বছর একটু একটু করে কমতে ৪ শতাংশের নিচে এসেছে। তবে ব্যতিক্রম বাংলাদেশি অভিবাসী নারীদের ক্ষেত্রে। ২০১৪ সালে মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের একটি ডায়াসফোরা বা নির্দিষ্ট কমিউনিটিভিত্তিক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশি নারীদের শতকরা ৫৪ জনই কর্মহীন।
এই প্রতিষ্ঠানটির কথা ধরলে বলতে হয়, ৫৪ শতাংশ বাংলাদেশি নারীর কোনো চাকরি নেই। তবে এটি ঠিক, এসব নারী ঘরের যাবতীয় কাজ করেন। সেই হিসেবে তাঁরা কাজের মধ্যেই আছেন।
২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই কমিউনিটিভিত্তিক নানা তথ্য-উপাত্তের যে জরিপ চালানো হয় সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, আমেরিকায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২ লাখ ৭৭ হাজার। ওই পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশি পুরুষের সংখ্যা, দেশের বাদ বাকি সম্প্রদায়ের গড় পড়তা পুরুষের উপস্থিতির মতোই। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এই উপস্থিতি ‘উল্লেখযোগ্য’ হারে কম।
জরিপে দেখা গেছে, সারা দেশে সাধারণত ৩৮ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে চান না। তবে বাংলাদেশি নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৫৮ শতাংশ।
বাংলাদেশি অভিবাসী নারীরা কেন কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে সেটার কারণ ব্যাখ্যা করেন স্বপ্ন এনওয়াইসি নামক একটি বেসরকারি সংস্থার প্রকল্প পরিচালক মাইশা হোসাইন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি নারীরা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার বড় কারণ হলো, তাদের ভাষাগত দুর্বলতা ও আমাদের পারিবারিক গঠন। বেশির ভাগ অভিবাসী নারী বাংলাদেশেও গৃহিনী ছিলেন, এখানেও তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি। ফলে তারা কর্মক্ষেত্রে ঢুকতে স্বস্তি বোধ করেন না। আবার দেখা যায়, আমাদের পারিবারিক গঠনে নারীকে বাসায় বাচ্চাদের দেখাশোনা, স্বামী ও পরিবারের রান্নাবান্নার দিকটাই বেশি খেয়াল করতে হয়। সে কারণে, নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের হার কম, অন্যদের চেয়ে কম।’
মাইশা বলেন, ‘এই মুহূর্তে কত ভাগ নারী ঘরের বাইরে কাজ করেন না, আমার জানা নেই। কিন্তু তাদের সংখ্যা যে বেশি সেটা ধারণা করা যায়। আমাদের ভাষাগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এখানে আমরা প্রায় ৫০-৬০ নারীকে ভাষা শেখাচ্ছি।’
মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, আমেরিকায় বাংলাদেশি পরিবারগুলোর গড় আয় বছরে ৫৪ হাজার ডলার। যেখানে দেশের সামগ্রিক পরিবার প্রতি গড় আয় ৫০ হাজার ডলার। ২ লাখ ৭৭ হাজার নাগরিকদের মধ্যে ওই সময়ে কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজারের বেশি মানুষ। বাংলাদেশি পরিবার প্রতি সদস্য সংখ্যা গড়ে সাড়ে ৩ দশমিক ৫ জন। আর মার্কিনসহ অন্যান্য কমিউনিটির পরিবারের সদস্য সংখ্যা গড়ে ২ দশমিক ৫ জন।
নারী অধিকার ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে সেফেস্ট নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যার প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি মাজেদা উদ্দীন। তিনি বলেন, এই সমস্যার সমাধানে প্রথমে পুরুষদের শিক্ষিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এরপর নারীদেরকে শিক্ষিত করতে হবে। পরের ধাপ অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা। ‘
একজন সমাজ কর্মী হিসেবে মাজেদা উদ্দীন কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রবেশ নিয়ে এমন নানা সামাজিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন। গত ফেব্রুয়ারিতে জ্যামাইকায় একটি বাংলাদেশি পরিবারের বিচ্ছেদ হয়েছে শুধু ঘরের বাইরে কাজে যোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে। মাজেদা জানান, জ্যামাইকায় হেলথ ডিপার্টমেন্টে কর্মরত রুহুল আহমেদ নামে এক ব্যক্তি গত ২১ ফেব্রুয়ারি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। রুহুলের স্ত্রীর অভিযোগ, বিয়ের পর তাঁকে রুহুল হাত খরচের অর্থ দিতেন না। ঘরে আবদ্ধ থাকতেন। এ অবস্থায় তিনি এক সময় সাবওয়েতে কাজ করতে ঢুকে পড়েন। এরপরই তাঁর স্বামী বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটান।
মাজেদা বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, ঘরের বাইরে কাজ বা চাকরিদে বাংলাদেশি নারীরা সবচেয়ে পিছিয়ে। ৭২ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীদের কাজে প্রধান বাধা স্বামীরাই। তারা চায় না, স্ত্রী কাজে যাক। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীরা বলেন, স্ত্রী রাস্তায় বের হলে পুরুষের সম্মান থাকে না। এটা অনেক শিক্ষিত মানুষও বলে থাকেন। এই কমিউনিটিতে নারীরা কীভাবে কাজ করবেন?