মিয়ানমারের সেনাদের বিচারে চাই আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ

>
  • রোহিঙ্গা সংকট
  • নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত বিতর্কে জাতিসংঘের মহাসচিব।
  • যথারীতি মিয়ানমারের পক্ষে বললেন চীন ও রাশিয়ার প্রতিনিধি।
আন্তোনিও গুতেরেস, কেট ব্লানচেট
আন্তোনিও গুতেরেস, কেট ব্লানচেট

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, গত এক বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট আর মানবাধিকার সমস্যার একটি হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা। ওই অপরাধের অভিযোগে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ জরুরি।

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের এক বছর পূর্তিতে নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত বিতর্কে তিনি এ আহ্বান জানান। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় অনুযায়ী গত মঙ্গলবার বিকেলে ওই বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।

নিরাপত্তা পরিষদের আগস্ট মাসের সভাপতি যুক্তরাজ্যের অনুরোধে ও সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিতর্কে অধিকাংশ বক্তাই মহাসচিবের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনের অপরাধে অভিযুক্ত মিয়ানমারের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যথাযথ বিচারের দাবি তোলেন।

আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, মিয়ানমার যত যুক্তিই দেখাক না কেন, সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও তাদের দোসরেরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে নির্বিচার শক্তি প্রয়োগ ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন করেছে, কোনো যুক্তি দিয়েই তা ন্যায়সংগত প্রমাণ করা যাবে না।

এক দিন আগে প্রকাশিত জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদনের উল্লেখ করে মহাসচিব বলেন, এই মিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে প্রমাণ পেয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহই থাকে না যে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী আন্তর্জাতিক আইনের চোখে গুরুতর অপরাধ করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে মিয়ানমার, বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর সঙ্গে একাধিক চুক্তিতে সই করেছে। এসব চুক্তি বাস্তবায়নে যে অঙ্গীকার প্রয়োজন, তার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

১৫ সদস্যের এই পরিষদের প্রায় সবাই মিয়ানমার সরকার ও তার নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিযুক্ত করে বক্তব্য দিলেও ভিন্ন সুরে কথা বলেন চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত। চীনা রাষ্ট্রদূত উ হাইতাও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সাম্প্রতিক আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। এটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমস্যা। তাদেরই দ্বিপক্ষীয়ভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। উভয় দেশকে সমানভাবে সাহায্য করতে চীন প্রস্তুত।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, সমস্যা সমাধানের একটি পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা ঠিক হবে না, বরং শরণার্থী প্রত্যাবাসন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তার সমাধান খুঁজতে হবে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া চীনা প্রতিনিধির বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, এটি একটি দ্বিপক্ষীয় সমস্যা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকেই তার সমাধান করতে হবে।

অধিকাংশ বক্তাই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হেইলি বলেন, প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মহানুভবতা দেখিয়েছে, তার ফলে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ১ হাজার ২৪ জন রোহিঙ্গার সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে ‘জাতি নির্মূলকরণের’ স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। এই পরিকল্পিত জাতি নির্মূলকরণের জন্য একমাত্র দায়ী সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী।

কুয়েতের রাষ্ট্রদূত মনসুর আইয়াদ আলোতাইয়েবিও রোহিঙ্গা নিধনকে ‘জাতি নির্মূলকরণ’ নামে অভিহিত করে বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন ওঠে না। রোহিঙ্গাদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অপর পূর্বশর্ত হলো রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্যের মূল কারণ খুঁজে তার সমাধান।

পরিষদের সভাপতি যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ-বিষয়ক মন্ত্রী তারিক মাহমুদ আহম্মদও মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত ও অপরাধীদের যথাযথ বিচারের ওপর জোর দেন। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য ভুলে মানবতার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত হাউ ডো সুয়ান পরিষদের সামনে ইতিপূর্বে প্রদত্ত বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, তাঁর সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে গত ২৩ জানুয়ারি থেকে তৈরি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার শরণার্থী প্রত্যাবাসনের কাজ শেষ করতে সক্ষম হয়নি। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদন বাতিল করে তিনি বলেন, এই মিশনের নিরপেক্ষতা বিষয়ে তাঁর গভীর সন্দেহ রয়েছে।

মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য তাদের মধ্যে আস্থা জাগাতে হবে। তারা ফিরে গেলে নিরাপদে থাকবে ও বৈষম্যের শিকার হবে না, এমন বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তেমন আস্থা সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। আস্থা সৃষ্টি করতে প্রাথমিকভাবে কী করা উচিত, রাষ্ট্রদূত মাসুদ তার একটি তালিকা দেন। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ সংস্থাসমূহের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী সীমান্তে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন করা, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ ও রোহিঙ্গা নিধনে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিচারের প্রক্রিয়ায় আনা।

এদিনের বিতর্কে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বক্তব্যটি প্রদান করেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র শিল্পী ও জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট। তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের শিবিরে তাঁর সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি একজন মা, শরণার্থী শিশুদের চোখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজের সন্তানদের দেখতে পেয়েছি। লায়লা নামে এক শরণার্থী ও তাঁর ছেলে ইউসুফের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ব্লানচেট বলেন, তারা স্বচক্ষে নিজের ঘরবাড়ি পুড়ে যেতে দেখেছে, মানুষকে আগুনকে পুড়িয়ে মারা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে।

 ‘একজন মা কীভাবে নিজ চোখে তাঁর সন্তানদের আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা দেখে তা সহ্য করবেন, বলতে পারেন?’ প্রশ্ন রাখেন কেট ব্লানচেট।

সু চির নোবেল কেড়ে নেওয়া হবে না

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির শান্তির নোবেল কেড়ে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে নরওয়ের নোবেল কমিটি। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যার উদ্দেশ্য থেকেই রাখাইনে হত্যা-নির্যাতন চালিয়েছে এবং এ নৃশংসতার রাশ টানতে সু চি ব্যর্থ হয়েছেন বলে গত সোমবার জাতিসংঘের প্রতিবেদনের পর এ কথা জানাল নোবেল কমিটি।

গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে নোবেল কমিটি বলেছে, এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে পদার্থ, সাহিত্য বা শান্তি সব ক্ষেত্রেই নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় অতীতের কোনো ভালো কাজ বা অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে। সু চিকে দেওয়া হয়েছিল গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত তাঁর কাজের জন্য। নিয়ম অনুযায়ী নোবেল পুরস্কার দেওয়ার পর তা প্রত্যাহার করা যায় না।