
এখনো কলকাতার বিদ্বজ্জনেরা বুঝে উঠতে পারছেন না, কেন এমনতর হয়ে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বামফ্রন্টের একটানা ৩৪ বছরের শাসনকে ‘স্বৈরশাসন’ আখ্যা দিয়ে ২০১১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গে উড়িয়েছিলেন গণতন্ত্রের পতাকা।
আর সেই মমতার ‘স্বৈরতন্ত্রের’ মুখ নতুন করে ভেসে উঠেছে আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনে। মমতা বারবার বলে এসেছেন, মানুষ এবার ভোট দেবে তাঁর উন্নয়নকাজ দেখে। গ্রাম ভাসছে উন্নয়নের জোয়ারে। তবু কেন মমতা এবার পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোট না করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের উদ্যোগ নিলেন?
বিজেপির উত্থানে তিনি কি শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন?
পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় সরকারকাঠামোর মূল স্তম্ভ ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি গ্রামে রয়েছে গ্রাম পঞ্চায়েত। থানা পর্যায়ে রয়েছে পঞ্চায়েত সমিতি আর জেলা পর্যায়ে রয়েছে জেলা পরিষদ। এবার এই ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতব্যবস্থায় গ্রাম পঞ্চায়েতে ভোট হচ্ছে ৪৮ হাজার ৬৫০টি আসনে। পঞ্চায়েত সমিতিতে ভোট হচ্ছে ৯ হাজার ২১৭টি আসনে। আর ২০টি জেলার জেলা পরিষদে ভোট হচ্ছে ৮২৫টি আসনে। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন এই প্রতিনিধিরা। প্রত্যেক ভোটারও তিনটি পৃথক ব্যালটে ভোট দেবেন তাঁদের পছন্দের প্রার্থীদের। আর এই ভোটের দায়িত্বে থাকে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থা হলেও এখন চলে গেছে রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণে।
গত ৩১ মার্চ নির্বাচন কমিশন বিজ্ঞপ্তি জারি করে ঘোষণা করে নির্বাচনের তারিখ। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার নির্ঘণ্ট। ২ এপ্রিল থেকে শুরু হয় রাজ্যব্যাপী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কাজ। ভোটের তারিখ নির্ধারিত হয় ১,৩ ও ৫ মে। আর ওই তারিখ থেকেই শুরু হয় এই রাজ্যের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর আঘাত। তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীসহ সবাই আগেভাগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এবারের এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে শতভাগ আসনেই জিতবে তৃণমূল। মমতাও মনোনয়নপত্র দাখিলের পর একই ঘোষণা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মানুষ ভোট দেবে গ্রামের উন্নয়ন দেখে। ভোটের জন্য আর হাত পাততে হবে না ভোটারের কাছে।
তৃণমূলের নীতিকে কার্যকর করার জন্য রাজ্যজুড়ে নেমে পড়ে তৃণমূলের নেতা-কর্মী এবং বিশেষ বাহিনী। শুরু হয় মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধাদান পর্ব। এসডিও, বিডিও অফিসে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য যাতায়াতের বহু পথ বন্ধ করে দেয় তারা। বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেওয়া, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া, বিরোধীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হুমকি-এসব চলে।
রাজ্যব্যাপী শুরু হয়ে যায় ক্ষমতা দখলের তাণ্ডব। মানুষও ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে হারানোর জন্য যেসব বিদ্বজ্জন কলকাতাসহ রাজ্যের সর্বত্র নেমেছিলেন ‘পরিবর্তন চাই’ দাবি নিয়ে, তাঁদের একাংশও এবার বিরোধিতায় নামেন মমতার স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া নিয়ে বিরোধীদের বাধাদানের বিরুদ্ধে বিরোধী কংগ্রেস, বাম দল, বিজেপি, পিডিএসসহ অন্যান্য দল শরণাপন্ন হয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টের। বিরোধী দলের এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টকে নির্দেশ দিলে হাইকোর্ট প্রথম পর্যায়ে পঞ্চায়েত নির্বাচন কার্যক্রমের ওপর অস্থায়ী স্থগিতাদেশ জারি করেন।
এরপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য এক দিন বাড়িয়েও দেন। কিন্তু সেই বাড়ানোর দিনও সহিংসতা করে তৃণমূল। সংঘর্ষে মারাও যান দুজন।
এসব ঘটনার মাঝেই মনোনয়নপত্র জমাদানের পর্ব শেষ হয়ে যায়। শেষ হয়ে যায় মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর্বও। নির্বাচন কমিশন তিন দিনের পরিবর্তে ১ দিন, অর্থাৎ ১৪ মে ভোটদানের তারিখ নির্ধারণ করে।
এরপরই ধরা পড়ে শাসক দলের তাণ্ডবের আসল চিত্র। ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন শাসক দলের প্রার্থীরা।
শুধু কি তাই? নির্বাচনের আগেই তিনটি জেলা পরিষদ দখলে নেয় শাসক দল। এর মধ্যে বীরভূমের জেলা পরিষদের ৪২টি আসনই কবজা করে তৃণমূল। বিরোধীদের কোনো প্রার্থীকেই এখানে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। আর মুর্শিদাবাদ ও বাঁকুড়া জেলার জেলা পরিষদের অধিকাংশ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় করে নেয় তৃণমূল। শুধু তা-ই নয়, জেলা পরিষদের ২০৩টি, পঞ্চায়েত সমিতির ৩ হাজার ৫৯টি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৬ হাজার ৮১৪টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দখল করে নেয় তৃণমূল।
এসব ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়-তবে কি তৃণমূলের পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে? নাকি বিজেপির উত্থানে তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে? ইত্যাদি কারণে জেরবার মমতা এবার তাঁর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরে এগোতে চাইছেন। কিন্তু পারবেন কি তিনি?