বিচারপ্রার্থীদের দিকে একটু তাকান
রাজধানীর মিরপুর থানার কল্যাণপুরের গৃহবধূ সামিয়া লায়লা আরজুমান খান গত বছরের ৭ জুন রাতে খুন হন। এ ব্যাপারে সামিয়ার ভাই ফরহাদ হোসেন সামিয়ার স্বামী আলমগীরকে আসামি করে মিরপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সামিয়ার মৃত্যুর এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মামলার তদন্তকাজই শুরু হয়নি। কারণ, সামিয়ার দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গঠিত কমিটির মতামত পাওয়া যায়নি।
শুধু সামিয়া হত্যা মামলায় নয়, দেশে এমন বহু অপমৃত্যু ও হত্যা মামলার তদন্ত আটকে আছে যথাসময়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায়। অথচ সরকারি নির্দেশনা আছে ময়নাতদন্তের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসককে প্রতিবেদন দেওয়ার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এক-দেড় বছরেও পাওয়া যায় না ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। এ কারণে আটকে থাকে মামলার তদন্ত। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন বিচারপ্রার্থীরা। অথচ দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে হত্যা মামলার ক্ষেত্রে আসামি চিহ্নিত এবং ধরা সহজ হয়।
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে অজ্ঞাত এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে শেরেবাংলা নগর থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়। ১৪ মাস পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, ঘটনাটি হত্যা। পরে এটি হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়। কিন্তু লাশের ময়নাতদন্ত করা চিকিৎসক ১৬ মাসেও প্রতিবেদন দেননি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) চলতি বছরের শুধু মার্চ মাসের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়ায় ঢাকার বিভিন্ন থানায় আটকে আছে ৫৭৬টি মামলার তদন্ত। এসব ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তারাও অসহায় হয়ে পড়েন। অনেক সময় দেখা যায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসককে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও নানা ব্যস্ততার কথা বলে তাঁরা প্রতিবেদন দিতে দেরি করেন। ফলে কিছুই করার থাকে না তাঁদের।
১০ জুন প্রথম আলোর অনলাইনে প্রকাশিত ‘মাকে খুব কষ্ট দিয়ে মেরেছে’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সামিয়া হত্যা মামলার এই তদন্ত ঝুলে থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়। এতে বলা হয়, ২০১৭ সালে দেওয়া প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সামিয়া আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ওই সময় বিষয়টি নজরে আনা হলে হাইকোর্ট প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসককে তলব করেন। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত এক আদেশে বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা উচিত। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং মামলার কেস ডকেট অনুসারে প্রতীয়মান হয়, আবারও মতামত নেওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। হাইকোর্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে সামিয়ার মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করে মতামতসহ তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তাকে পরিবর্তন করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তবে এখনো কোনো প্রতিবেদন না দেওয়ায় মামলার তদন্ত ঝুলে আছে। কবে তারা প্রতিবেদন দেবে, তার কোনো তার নিশ্চয়তা কে দেবে? যেখানে আদালতের নির্দেশনাই প্রতিপাদন করা হচ্ছে না?
অথচ সামিয়াকে যে হত্যা করা হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ খুব কমই আছে। কারণ, পুলিশের করা লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে সামিয়াকে খুনের আলামত স্পষ্ট। আর পাঁচ বছরের শিশুসন্তানের সামনে সামিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করেন তাঁর স্বামী। গত বছরের ৮ আগস্ট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে শিশুটি সে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনাও দিয়েছে। কিন্তু যেহেতু যেকোনো হত্যা মামলার ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেহেতু তা না পাওয়া পর্যন্ত তদন্তই শুরু করা যায় না।
মনে প্রশ্ন জাগে কেন এই বিলম্ব? যেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রশ্ন জড়িত, সেখানে এই বিলম্বের কি আসলেই কোনো যৌক্তিক কারণ আছে? নাকি চিকিৎসক আর পুলিশের আইনের প্রতি অবহেলা এ ক্ষেত্রে প্রধান কারণ?
গত বছর প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজসহ সারা দেশে ১৩টি মেডিকেল কলেজে ময়নাতদন্ত হয়। এই বিভাগে তীব্র জনবলসংকট রয়েছে। ফলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি হয়। প্রতিদিন গড়ে আটটি লাশের ময়নাতদন্ত হয়। একটির প্রতিবেদন লিখতে আধা ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এ ছাড়া বিভাগীয় শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা, আদালতে সাক্ষ্য, বয়স নির্ণয়ের পরীক্ষা, ধর্ষণের ঘটনার ফরেনসিক পরীক্ষাসহ নানা কাজের ব্যস্ততা থাকে। ফলে প্রতিবেদন দিতে দেরি হয়। এ ছাড়া ময়নাতদন্তের জন্য চিকিৎসকেরা আলাদা কোনো সম্মানী পান না। উল্টো আবার আদালতে সাক্ষ্য দিতে যেতে হয়। তাই যথাসময়ে প্রতিবেদন দিতে তাঁদের আগ্রহ থাকে কম।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেতেই যদি বছরের পর বছর লেগে যায়, তাহলে বিচারপ্রার্থীদের মনের অবস্থা কেমন দাঁড়ায়, তা সহজেই অনুমেয়। শুধু ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলেই তো আর বিচার পাওয়া যায় না; এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলার তদন্ত হবে। এরপর চার্জশিট দেবে পুলিশ। তারপর সাক্ষী-শুনানি, এত কিছু করতে কত সময় লাগবে, তার কোনো সীমা নেই। তাহলে মামলার বিচার হবে কবে? তাই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব হওয়াটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মনে হচ্ছে, জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপের সময় হয়েছে।
ময়নাতদন্তের কাজে যদি জনবলের স্বল্পতা থাকে, তাহলে সরকারকে দ্রুত সেখানে জনবল নিয়োগ দিতে হবে। এ কাজে নিযুক্ত চিকিৎসকদের যথোপযুক্ত সম্মানী দিতে হবে। এমন অভিযোগও পাওয়া যায় যে চিকিৎসকেরাও বিবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দিতে দেরি করেন। অভিযোগ আছে অর্থের বিনিময়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাল্টে দেওয়ার। আবার ময়নাতদন্তের ভুলে হত্যা হয়ে যায় আত্মহত্যা—এমন অভিযোগও রয়েছে।
গত ২৪ মার্চ প্রথম আলোয় ‘ময়নাতদন্ত রিপোর্টের ভুলে হত্যা হয়ে যায় আত্মহত্যা’ শিরোনামের এক প্রতিবেদন ১০টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে সুরতহাল রিপোর্টে স্পষ্ট হত্যার আলামত ছিল। কিন্তু তা বদলে গেছে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে।
এ ক্ষেত্রে সরকারকে তদারকির ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আর এসব পদক্ষেপ না নিলে সামিয়ার ভাইয়ের মতো বহু বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা কোনো দিনই পূরণ হবে না।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক