গল্পগুলো নিউইয়র্কের বইমেলায় শোনা

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কখনো বসে বক্তৃতা করেন না। তাঁর শরীর যতই অসুস্থ থাকুক না কেন।

কেন করেন না?

সেই গল্পটাও জানা গেল নিউইয়র্কে বসে। ওখানে অনুষ্ঠিত হলো বইমেলা। তাতে ঢাকা থেকে প্রকাশকেরা যোগ দিয়েছেন, লেখক-শিল্পীরা গেছেন, উত্তর আমেরিকা তো বটেই, জার্মানি থেকে পর্যন্ত গেছেন বাংলা ভাষার লেখকেরা। নিউইয়র্কে ২৭ বছর ধরে হয়ে আসছে এই বাংলা বইমেলা। এর আয়োজক মুক্তধারা নিউইয়র্ক। এ বছর ২২, ২৩ ও ২৪ জুনে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে অনুষ্ঠিত হয় বইমেলা।

তাতে একটা পর্বে বক্তা ছিলেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। আমি স্যারের সঙ্গে দেখা করে জানতে চাইলাম, কেমন আছেন?

স্যার বললেন, নাহ্‌। বেশ খারাপ।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিজে যখন ছাত্র ছিলেন, তখন একদিন তাঁদের ক্লাসে একজন শিক্ষক এলেন ক্লাস নিতে। স্যারকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তিনি ভীষণ কাহিল। গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না। দাঁড়াতেও পারছেন না।

ছাত্ররা বলল, স্যার, আপনি বসে বক্তৃতা করুন।

স্যার বললেন, না, তা হয় না।

কারণ, আমি যখন ক্লাসরুমে ঢুকেছিলাম, তখন তোমরা দাঁড়িয়ে আমাকে সম্মান দেখিয়েছ। এখন আমার কর্তব্য হলো, সেই সম্মান তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া। কাজেই আমি যতক্ষণ ক্লাস নেব, ততক্ষণ আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদও নিউইয়র্কের বইমেলার মঞ্চে অসুস্থ শরীর নিয়েও দাঁড়িয়ে কথা বললেন।

আর অধ্যাপক সায়ীদ যখন কথা বলেন, তখন শুধু তাঁর নিজের অসুস্থতাই যে উড়ে পালিয়ে যায়, তা নয়, তাঁর সমস্ত শ্রোতাও সজীব-সতেজ হয়ে পড়ে।

তা-ই হলো।

নিউইয়র্কের বইমেলায় গিয়েছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। বইমেলা উদ্বোধন করেছেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। উদ্বোধনের পরের বক্তৃতায় শামসুজ্জামান খান জানালেন, বইমেলা ঢাকায় প্রথম শুরু করেন সরদার জয়েন উদ্দীন। তাঁর কাছে বিদেশি বইমেলার চিঠি এসেছিল। তিনি তখন ভাবলেন, বাহ্‌, এ তো ভীষণ আশ্চর্য এক মেলা, কত কিছুর মেলার কথা শুনেছি, বারুনির মেলা, রথের মেলা, হাঁড়িকুঁড়ির মেলা, তরমুজের মেলা—বইয়েরও মেলা হয়! তিনি নারায়ণগঞ্জে বইমেলার আয়োজন করেন। সেখানে একটা গরু বাঁধা ছিল। তার গায়ে লেখা ছিল: আমি বই পড়ি না।

আনোয়ারা সৈয়দ হকও গিয়েছিলেন মেলায়। তিনি যেমন কবি ও কথাসাহিত্যিক, তেমনি তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। একটা ঘরোয়া সেমিনারে তিনি বললেন, লেখালেখি একধরনের মানসিক ব্যাধি। ওসিডি। অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার। এই ধরনের রোগীরা একটা জিনিস নিয়ে বারবার করে বলতে থাকে, একই জিনিস বারবার করতে থাকে। কারও হয়তো মনে হয়, বাসা থেকে বেরিয়েছি, ঘরে তালা দেওয়া হয় নাই। তিনি বারবার করে ফিরে আসেন। দেখেন, তালা দেওয়া হয়েছে তো। কেউবা শুধু হাত ধোয়। বারবার করে হাত ধোয়। তারপরও মনে হয়, হাতে ময়লা লেগেই আছে। তো যার এই রোগ আছে, সে হয়তো একবার হাত ধুলো, দুবার হাত ধুলো, পাঁচবারের পর মনে হলো, এবার পরিষ্কার হয়েছে। সে শান্ত হলো। শান্তি পেল। কিন্তু কতক্ষণ আর। একটু পর সে আবার হাত ধুতে শুরু করল।

লেখকেরাও এই রকম। একটা লেখা লিখে মনে হবে, হয়নি। আবার লিখতে হবে। আবারও লিখল। তারপর মনে হলো, না, হয়নি। আবার লিখল। একবার মনে হলো, হ্যাঁ, হয়েছে। খানিকক্ষণ শান্তি। কিন্তু সেও ক্ষণিকের। আবারও লিখতে শুরু করল।

নিউইয়র্কের কবি আবু রায়হান আমার বন্ধুমানুষ। গাড়িতে করে তিনি আমাদের নানা জায়গায় নিয়ে গেছেন। ওসিডি নিয়ে তিনি এবার একটা কৌতুক বলেছেন, প্রসঙ্গত বলে ফেলা যায়। এক রোগী মানসিক চিকিৎসককে বলল, আমার সমস্যা হলো সব সময় মনে হয়, খাটের নিচে চোর লুকিয়ে আছে। আমি তাই রাতের বেলা বিছানা থেকে নেমে খাটের নিচে তল্লাশি করি, দেখি চোর আছে কি না, তখন মনে হয় চোর আমার পেছনে। তখন খাটে বসি, দেখি সামনে চোর নাই, তাহলে নিশ্চয়ই খাটের নিচে আবার লুকিয়েছে। সারা রাত এই করি। আর ঘুম হয় না।

ডাক্তার বললেন, আপনার ওসিডি হয়েছে, সেরে যাবে, আপনি সপ্তাহে দুই দিন সেশন দেবেন আমার সঙ্গে, প্রতি সেশনে লাগবে ৫০০ ডলার।

পরে রোগী আর আসেন না।

ডাক্তারের সঙ্গে পথে তাঁর দেখা। ডাক্তার বললেন, কই, আর তো এলেন না।

রোগী বললেন, আপনি সপ্তাহে ১০০০ ডলার চেয়েছেন, বছরে ৫২ হাজার। আমি ১০ ডলারে কাজ সেরে ফেলেছি।

কী রকম?

আমি ১০ ডলার দিয়ে একটা করাত কিনে খাটের পায়া চারটা কেটে ফেলেছি।

আবু রায়হান গাড়িতে চলতে চলতে বললেন, আরেকটা কৌতুক বলি! বইমেলা নিয়ে! সময় প্রকাশনীর ফরিদ আহমেদ বললেন, বলেন।

তিনি বললেন, নিউইয়র্কের এক সংগঠন তাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে বইমেলা করতে বলল। আমি এখানে একটা প্রকাশকের প্রতিনিধি হিসেবে বইমেলায় নিয়মিত স্টল দিতে অভ্যস্ত। গেলাম সেখানে। স্টল দিলাম।

বাঙালিরা এল। গান–বাজনা হলো। এক কপি বইও বিক্রি হলো না।

তাই দেখে ওই ভবনের স্প্যানিশ দারোয়ানের বড় মায়া হলো। অনুষ্ঠানের শেষে, সবাই চলে গেলে সে বলল, তোমার কাছে কোনো ইংরেজি বই আছে। আবু রায়হানের কাছে হুমায়ূন আহমেদ আর মুহম্মদ জাফর ইকবালের সময় প্রকাশনী প্রকাশিত দুটো অনুবাদ ছিল। সেই বিদেশি ১০ ডলার দিয়ে দুটো বই কিনে নিয়েছিল। কারণ, দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে দেখেছে, এই লোকের স্টলের একটা কপি বইও বিক্রি হয়নি।

এটা কৌতুক নয়। খুবই গুরুতর এক প্রসঙ্গ। নিউইয়র্কের বইমেলায় ঝালমুড়ি বিক্রি হলো পাঁচ ডলার করে, কেউ দাম বেশি বলে অভিযোগ করে না। কিন্তু বইয়ের দাম সব সময়ই মনে হয় বেশি।

২০১৮ সালের বইমেলায় ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। গিজগিজ করেছে মানুষ। দারুণ বিক্রি হয়েছে বই।

প্রথমা প্রকাশন যত বই নিয়ে গিয়েছিল, সব বিক্রি হয়ে গেছে।

অভিনন্দন মুক্তধারার বইমেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

ভালোভাবে আয়োজন করা গেলে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বইমেলাগুলোও দারুণভাবে সফল হবে, আশা করা যায়।

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক