কর্তৃত্ববাদী শাসন ও গণমাধ্যম

গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতা সারা পৃথিবীতেই এখন বিপদের মুখোমুখি। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা—দুই-ই এখন এমন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে যে তাকে উদ্বেগজনক বললে সামান্যই বলা হয়। এই দুই বিষয় অবশ্যই একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, কিন্তু একই সঙ্গে এত ব্যাপকভাবে এই দুইয়ের অবনতি অভূতপূর্ব। গণমাধ্যমের এই অবস্থায় কারণ এবং প্রতিক্রিয়া কেবল এই পেশার মধ্যে সীমিত আছে তা নয়, বরং তার পরিণতি ক্রমাগতভাবে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে এবং সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করেছে।

গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) ২০১৮ সালের গোড়াতে যে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল তাতে দেখা যায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিবেচনায় মাত্র ৯ শতাংশ দেশের অবস্থাকে ‘ভালো’ বলে বর্ণনা করা যায়; মোটামুটি ভালো ১৭ শতাংশ দেশে। অর্থাৎ ৭৪ শতাংশ দেশেই অবস্থা খারাপ, এর মধ্যে ১২ শতাংশ দেশের অবস্থা ভয়াবহ। মানচিত্রে এসব দেশকে কালো রঙে চিত্রিত করে আরএসএফের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, এর আগে এত দেশকে কালো রঙে চিত্রিত করতে হয়নি।

দেশে দেশে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের দিকে নজর রাখে ফ্রিডম হাউস। ফ্রিডম হাউসের হিসাব অনুযায়ী, সারা পৃথিবীর মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ ‘মুক্ত গণমাধ্যমের’ দেশে বাস করে আর ৪৫ শতাংশ মানুষের বাস এমন দেশে, যেখানে সংবাদমাধ্যম ‘মুক্ত নয়’। আরএসএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ৬৫ জন সাংবাদিক, সংবাদকর্মী ও সিটিজেন জার্নালিস্টের প্রাণহানি ঘটেছে। এঁদের মধ্যে ৩৯ জনকে পরিকল্পনা করে হত্যা করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংগঠন আর্টিক্যাল ১৯-এর হিসাব অনুযায়ী, এই বছরের ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৮২ জন সাংবাদিক পেশাগত কারণে নিহত হয়েছেন। এসব বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থা বিষয়ে যা বলা হয়েছে তার দিকে তাকালে যা সহজেই দেখা যায় তা হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমাগতভাবে নিম্নমুখী হয়েছে। এর একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ২ নভেম্বর ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে টু এন্ড ইম্পিউনিটি ফর ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট জার্নালিস্ট’—অর্থাৎ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়মুক্তি অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস। ২০১৩ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর দিনটি পালন করা হয়। এই উপলক্ষে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে সবচেয়ে খারাপ দেশগুলোর যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১২ নম্বরে।

বৈশ্বিকভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের এই ঘটনাগুলো যেভাবে ঘটছে, তার অন্যতম হচ্ছে নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন এবং সেগুলোর ব্যাপক নির্বিচার ব্যবহার। এ ছাড়া রয়েছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ব্যক্তিমালিকানাধীন গণমাধ্যমের প্রতিষ্ঠা এবং তার প্রতি পক্ষপাত। সর্বোপরি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায় থেকে বিষোদ্গার। এই বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তাঁর ভাষায়, গণমাধ্যম ফেক নিউজ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বানানো খবর প্রচার করে এবং গণমাধ্যম হচ্ছে ‘গণশত্রু’। কিন্তু সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো এবং তাঁদের শত্রু বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টায় ট্রাম্প একা নন। এই তালিকায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তুরস্কের রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান, ফিলিপাইনের রদ্রিগো দুতার্তে, মিসরের জেনারেল আবদেল ফাতাহ আল-সিসি, চেক প্রজাতন্ত্রের মিলোস জিমান, স্লোভাকিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকোর নাম সহজেই অন্তর্ভুক্ত করা যায়। ভারতেও গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের ওপরে বিভিন্নভাবেই চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতাদের আক্রমণাত্মক কথাবার্তা এবং আইনি প্রক্রিয়ার ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমাগতভাবে সংকুচিত হয়েছে। এটি কেবল প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের জন্য প্রযুক্ত তা নয়, তার ব্যাপ্তি বিস্তার লাভ করেছে সামাজিক মাধ্যমেও, সিটিজেন জার্নালিজমের ওপরে নেমে এসেছে খড়্গ—এর সঙ্গে যুক্তদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সরকারের পক্ষ থেকে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে সাংবাদিক ও নাগরিকেরা নিজেরাই একধরনের সেন্সরশিপ তৈরি করে নেন, এ হচ্ছে একধরনের স্বতঃপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণ, যার পেছনে আছে ভীতি।

গত এক দশকে সংবাদমাধ্যমের ওপরে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং সাংবাদিকদের ওপরে নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধির কারণ বুঝতে অসুবিধা হয় না, যখন আমরা এটা বিবেচনায় নিই যে এই সময়ে পৃথিবীজুড়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও সংকটে পড়েছে। ক্রমাগতভাবে দৃশ্যত গণতান্ত্রিক, কিন্তু কার্যত কর্তৃত্ববাদী শাসন বিস্তার লাভ করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচনের মাধ্যমেই যাঁরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁরাই এখন সব ধরনের মতপ্রকাশের উপায় বন্ধ করে দিতে চাইছেন। কেননা এসব আধা কর্তৃত্ববাদী শাসকদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে জবাবদিহির পথ রুদ্ধ করে দেওয়া। যেহেতু সংবাদমাধ্যমের কাজ হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্নবিদ্ধ করা, সেহেতু ক্ষমতাসীনেরা গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে একধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সংবাদমাধ্যম আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এই কারণেও যে গণমাধ্যম হচ্ছে সিভিল সোসাইটির অন্যতম অংশ। রাশিয়া থেকে তুরস্ক, ভিয়েতনাম থেকে বলিভিয়া—যেখানেই এই ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার ঘটেছে, সেখানেই ক্ষমতাসীন এবং তাঁদের সমর্থকেরা সিভিল সোসাইটির বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে আক্রমণ চালিয়েছেন। দক্ষিণপন্থী লোকরঞ্জনবাদী বা পপুলিস্ট রাজনীতির উত্থান কেবল গণতন্ত্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেই ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে তা নয়, সব ধরনের ভিন্নমত প্রকাশের পথকেই সংকুচিত করেছে—গণমাধ্যমের যে বিপদ বৈশ্বিকভাবে আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার উৎস এখানেই।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের ওপরে যেসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা প্রযুক্ত হয়েছে—সদ্য বাতিলকৃত আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার উপর্যুপরি প্রয়োগ, নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, প্রস্তাবিত সম্প্রচার আইন—সেগুলোর কারণ ও উদ্দেশ্য বোঝার জন্য বৈশ্বিক চিত্রটি বিবেচনায় রাখা দরকার কোথায়, কখন এবং কেন এই ধরনের আইনি ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়েছে। এই জন্য ওই সব দেশে যেমন, তেমনি বাংলাদেশেও বিরাজমান শাসনব্যবস্থার দিকেই তাকাতে হবে। এখানে সম্পাদক বা সাংবাদিকেরা যে আইনি ও আইনবহির্ভূতভাবে আক্রান্ত হন এবং তাঁদের ওপরে, এমনকি শারীরিকভাবে আক্রমণকারীরা যে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি ভোগ করেন, তা কোনো অবস্থাতেই জবাবদিহিহীন কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বাইরে নয়।

মনে রাখা দরকার, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা সীমিত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকবে, এটি একটি অবাস্তব প্রত্যাশামাত্র; পৃথিবীর অন্য কোনো দেশেই তা ঘটেনি। ফলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের বিরাজমান পরিস্থিতি এবং তার কার্যকারণ বুঝতে চান যাঁরা, তাঁদের অবশ্যই দেশের সার্বিক রাজনীতির দিকেই মনোযোগ দিতে হবে।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর