নির্বাচনের মাত্র ছয় দিন আগে সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, নির্বাচনী মাঠ সমতল করা ও ভোটারদের
মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে তা কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, সেটাই প্রত্যাশিত। তবে এত অল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির কতটা উন্নয়ন করা সম্ভব, সেটাও
এক বড় প্রশ্ন।
গত সোমবার সেনা মোতায়েনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনী মাঠে নামায় ভোটারদের আস্থা বাড়বে। সশস্ত্র বাহিনীর মাঠে নামার সঙ্গে যেহেতু ভোটারদের আস্থা বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে, সেহেতু এই কাজ সংগত কারণেই আরও আগে হওয়া উচিত ছিল। শুরুতে বলা হয়েছিল যে ১৫ ডিসেম্বরের পর সেনা মোতায়েন হবে। কিন্তু কী বিবেচনায় তা পিছিয়ে ২৪ ডিসেম্বর করা হলো, নির্বাচন কমিশনের কাছে সে প্রশ্ন তোলা খুবই সংগত। নির্বাচন নিয়ে কমিশন শুরু থেকেই নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্যত নির্বিকার থাকছে। সেনা মোতায়েনের তারিখ পেছানোর বিষয়টিকেও কমিশনের তেমনি একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সেনা মোতায়েনের প্রথম দিন অন্তত ১৭টি জেলার ২১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের গাড়িবহর, গণসংযোগ ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা চালানোর ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২২৬ জন আহত হয়েছেন। অথচ সেনা মোতায়েনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সিইসি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, অপ্রীতিকর কিছু এখন থেকেই নিয়ন্ত্রিত হবে।’ কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাতের ঘটনাগুলো অব্যাহত রয়েছে, যা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশকে নষ্ট করছে। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ভীতি বাড়াচ্ছে। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেনা মোতায়েনের পর হামলার ঘটনা অপ্রত্যাশিত।
এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক যে নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাকে কোনোভাবেই একটি স্বাভাবিক নির্বাচনী পরিস্থিতি বলা যাচ্ছে না। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই দেখা যাচ্ছে সরকারি দল ও জোটের প্রার্থীরা সহজে প্রচারণা চালাতে পারলেও বিরোধী প্রার্থীরা সে সুযোগ পাচ্ছেন না। অনেক স্থানে বিরোধী দলের প্রার্থীরা মাঠেই নামতে পারছেন না। বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সেনা মোতায়েন হলে পরিস্থিতি পাল্টাবে বলে বিভিন্ন তরফে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। সেনা মোতায়েনের পর এখন জনগণ পরিস্থিতির উন্নতি দেখতে চায়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সব ধরনের দায়িত্ব পালন করবেন। সেনাবাহিনীর সামনে যদি এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন, তখন তারা নিজ উদ্যোগে সেখানে গিয়ে সেই পরিস্থিতি সংযত করবে। ‘এইড টু সিভিল পাওয়ার’–এর অধীনে তারা দায়িত্ব পালন করবে।
আমরা মনে করি, নির্বাচনের আগে শান্তিপূর্ণ ও ভয়ভীতিহীন একটি পরিবেশ তৈরি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য জরুরি। জনগণের মধ্যে এমন আস্থার পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে তাদের মনে কোনো ধরনের শঙ্কা না থাকে। সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে, কিন্তু হাতে সময় খুবই কম। ফলে নির্বাচনের আগে আর যে চারটি দিন (২৬ থেকে ২৯ ডিসেম্বর) রয়েছে, সেই সময়ের মধ্যেই অবস্থার পরিবর্তন জনগণের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে।
আমরা আশা করছি, সেনাবাহিনী মোতায়েনের ফল হিসেবে খুব দ্রুতই একটি স্বাভাবিক নির্বাচনী পরিস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ৩০ ডিসেম্বর কোনো ধরনের শঙ্কা ছাড়াই উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে জনগণ ভোট দিতে যেতে পারবে।