কী হইব স্যার?

আমরা যারা গভীর রাতে অফিস থেকে ফিরি, তাদের কিছুটা ফুরসত মেলে গাড়ি বা সিএনজি অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলার। এসব আলাপের বেশির ভাগ থাকে সমাজ, সংসার, রাজনীতি, টাকাপয়সাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চারদিকে চলছে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক। মধ্যরাতের সেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তাই করোনার প্রভাব পড়েছে অনিবার্যভাবে।

নিয়মমাফিক মধ্যরাত পেরিয়ে ফিরছি বাসায়। রাস্তাঘাট ফাঁকা। বেওয়ারিশ কুকুর আর ছিন্নমূল মানুষ ছাড়া কেউ নেই। নিয়ন আলোর হলুদ আভা রাস্তার সবুজ গাছের মাথায় খেলা করছে অদ্ভুত মাদকতায়। সেই নিস্তব্ধ রাতের নীরবতা ভেঙে একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কানে এল। বুঝলাম, যুবক সিএনজি অটোচালক কিছু বলতে চান। এ দীর্ঘশ্বাস তারই গৌরচন্দ্রিকা। ‘দ্যাশেও বোলে করোনা আইল স্যার?’ বোঝার চেষ্টা করলাম এ ভাষা কোন এলাকার। বুঝতে পারলাম না তেমন। রাতের নিস্তব্ধতাকে উপেক্ষা করে সিএনজি অটোচালক বলেই চললেন, ‘দিন আনি দিন খাই স্যার। এইবার কন, যদি করোনা আয়া পড়ে, তাইলে কী করুম?’ আমি কিছু বলছি না দেখে চালক বললেন, ‘কিছু কন স্যার।’ বুঝলাম তিনি আশ্বস্ত হতে চাইছেন, অন্তত একটা আশার কথা হলেও শুনতে চাইছেন।

আমি কী বলব? করোনার জন্য যদি হোম কোয়ারেন্টিনে যেতেই হয়, যদি এই দুর্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়, যদি…কী হবে? এই অসংখ্য যদির উত্তর আমরা জানি না। আর জানি না বলেই এই যুবক সিএনজি অটোচালকের মতো আমরা সবাই কোথাও না কোথাও থেকে একটা আশার বাণী শুনতে চাইছি। সিএনজি অটোচালক এই যুবকটি সেটা বলেছেন মুখ ফুটে। আমরা অনেকে সেটা বলছি না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছি। আমরা যারা চাকরি করি, চাকরির ওপরেই যাদের সব ভরসা, তারাও তো দিনান্তের কামলাই বটে। সামনে খাদ পেছনে দেয়াল, কত দিকে আমরা রাখব খেয়াল? ভাবনা সবার।

রাস্তার গতিরোধকে একটা ঝাঁকি খায় সিএনজি অটোরিকশা। আমরা দুজনেই সংবিৎ ফিরে পাই। আমি আমার ভাবনার কথা বলি চালককে। বলি, আমি দুঃখিত আপনাকে অনেক তথ্য দিতে না পেরে। তবে অবস্থা যে ভালো নয় বরং দিন দিন খারাপ হচ্ছে, সেটা তো বুঝতেই পারছেন। সমস্যা হলো আমরা কেউ কিছু জানি না। আসলেই করোনা কতটা ছড়িয়েছে, কোথায় কোথায় ছড়িয়েছে, কত মানুষ ধরা খেল, কিচ্ছু জানি না। তাই আন্দাজে কিছু বলাটা ঠিক হবে না।

‘কিন্তু স্যার, আমগো পত্রিকায়ই তো লিখছে ৯০ না ৯৫ হাজার নাকি দ্যাশে ফিরছে। তার দুই–আড়াই হাজার নাকি ডাক্তারের কাছে গেছেগা। বাকিগুলার খবর কী?’ বুঝলাম, সংবাদ চাপা থাকে না। কোনো না কোনোভাবে ছড়াতেই থাকে। সত্যি তো, বাকিগুলো কই? কী অবস্থা? মনে পড়ল, কোথায় থেকে যেন পুলিশ বিদেশফেরত একজনকে বিয়ের আসর থেকে তুলে এনেছে। ঘটনাটা মনে পড়তেই হাসি এল। কী নিশ্চিন্ত মানুষ! আমার হাসির শব্দ শুনে সিএনজি অটোচালক বললেন, ‘হাসেন ক্যা স্যার!’ ঘটনাটা তাকে বললাম।

ফাঁকা রাস্তা। সহকর্মীকে গন্তব্যে নামিয়ে আমি একা। রাত প্রায় একটা বাজে। হলুদ নিয়ন আলোয় মাখামাখি করে সিএনজি অটোরিকশা ছুটছে। আমরা কোনো কথা বলছি না। কী বলব? বলেই বা কী হবে? এখন লোডশেডিং প্রায় হয় না বলে চারদিক আলোকিত। কিন্তু আশার আলো কোথাও নেই। সরকার স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু লোকজন ঘুরতে গেছে কক্সবাজার, পতেঙ্গায়। ভিড় এড়াতে বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, হচ্ছে সমাবেশ নানা অছিলায়। সমানে সবাই খক খক করে কাশছে, থুতু ফেলছে প্রায় গায়ের ওপর। তবে আশার কথা এই যে মানুষ আতঙ্কিত বা সাবধানী হয়ে বাসার বাইরে একটু কম আসছে।

সিএনজি অটো বাসার কাছাকাছি চলে এসেছে। চালক পুরোনো কথার সূত্র ধরে বললেন, ‘কী হইব স্যার? যদি সবকিছু বন্ধ হইয়া যায়গা?’ ভাবলাম, একটু দুষ্টুমি করি। বললাম, ঘুমাইবেন। মেলা দিন তো ঠিকমতো ঘুমান না। ঘুমটা দরকার শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর জন্য। অন্তত টানা দুইটা দিন ঘুম দেবেন। করোনা নাও আইতে পারে। তিনি হাসেন। সে হাসির অর্থ আমি বুঝি। সামনের ফিকে অন্ধকারে গাঢ় চোখ রেখে লোকটা ঠিকমতো সিএনজি অটো চালান রাস্তার গতিরোধক দেখে। হুট করে গলি থেকে একটা রিকশা এসে যায় সামনে। একটা গালি দিয়ে হার্ড ব্রেক করেন। তারপর সারা দিনের সব ক্ষোভ উগরে দেন রিকশাচালকের ওপর। আমি চুপ করে থাকি। এ দৃশ্য আমার মনে কোনো রেখাপাত করে না। গালাগালি বেশি হয়ে গেলে আমি চালককে তাড়া দিই। তিনি আবার সিএনজি অটোরিকশা স্টার্ট করেন।

বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চালক আগ বাড়িয়ে বলেন, ‘ভালো থাইকেন, স্যার। ভাগ্যে যা আছে তা ছাড়া কী আর হইব?’ আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে নেমে যাই গলির মুখে। এই এলাকার নাইট গার্ড আমাকে চেনেন। তিনি হাত তুলে সালাম দেন। একগাল হাসি দিয়ে তিনি বলেন, ‘স্যার, খবর ভালো?’ আমি তাঁকে বলি, কী হইব আমগো, কন তো? লোকটা হুইসেল বাজাতে বাজাতে চলে যান।

লেখক: সাংবাদিক
ই–মেইল: [email protected]