গোলরক্ষকেরা শুধু ম্যাচ বাঁচায় না, জেতায়ও

>বিশ্বকাপ শেষ ষোলোয় কাল রাতে দুই দলের জয়ের নায়ক দুই গোলরক্ষক। তাঁদের হাতে ভর করেই কোয়ার্টার ফাইনালের দেখা পেয়েছে রাশিয়া ও ক্রোয়েশিয়া। তবে ডেনমার্ক হারলেও মনে রাখার মতো পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন দলটির ক্যাসপার স্মেইকেল
ফিফার হিসাবে পেশাদার ফুটবলে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি ঠেকিয়েছেন তিনি। ১৯৬৩ সালে ইতিহাসের একমাত্র গোলরক্ষক হিসেবে জিতেছেন ব্যালন ডি’অর? তাঁকে নতুন করে চেনাতে হবে? লেভ ইয়াসিন ছিলেন সোভিয়েত আমলের ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’। এই ইয়াসিন একবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, পেনাল্টি ঠেকালে গোলরক্ষকদের কেমন লাগে, ‘ইউরি গ্যাগারিনকে মহাকাশে উড়তে দেখার মজাকে পেছনে ফেলতে পারে একটা ভালো পেনাল্টি ঠেকানোর আনন্দ।’
ইগর আকিনফিয়েভের কি ঠিক এমনটাই লেগেছে! একে তো ইয়াসিনের দেশের মানুষ, তার ওপর সোভিয়েত যুগে ইয়াসিন যে গোলপোস্টের নিচের দাঁড়াতেন, সেই জায়গাটা এখন আকিনফিয়েভের। শুধু দেশের নামটাই পাল্টেছে এই যা; তখন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, এখন রাশিয়া। দীর্ঘ ৫২ বছর পর কাল রাতে (বাংলাদেশ সময়) এই আকিনফিয়েভই ফিরিয়ে এনেছেন ইয়াসিনের স্মৃতি।
স্কোরলাইন বলছে, রাশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছে স্পেন। আসলেই কি তাই? যদি বলা হয়, স্পেন মুখ থুবড়ে পরেছে আকিনফিয়েভ দেয়ালে বারবার বাধা পেয়ে। টাইব্রেকারের আগে ১২০ মিনিটে ৯টি ‘সেভ’ করেছেন আকিনফিয়েভ। এর মধ্যে তিনটি সেভ তো রাশিয়াকে স্রেফ গোল হজম করা থেকে বাঁচিয়েছে। অর্থাৎ, এই ১২০ মিনিটে সিএসকেএ মস্কো গোলরক্ষক দেয়াল হয়ে না দাঁড়ালে ম্যাচটা টাইব্রেকার পর্যন্ত গড়াত না। আর স্নায়ুক্ষয়ী সেই শুটআউটেও তিনি কী চমকটাই না দেখালেন!

টাইব্রেকার ২-২ গোলে অমীমাংসিত থাকতে প্রথমে রুখে দিলেন কোকের শট। বাম প্রান্তে ঝাঁপিয়ে। এরপর রাশিয়া যখন ৪-৩ ব্যবধানে এগিয়ে তখন আকিনফিয়েভ যেন দেখালেন গোলরক্ষকেরা ডাইভ দেওয়া অবস্থায় চাইলে নিজেদের পা-টাও ব্যবহার করতে পারেন। আসপাসের শটের দিক না বুঝেই ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঠিক মিলি-সেকেন্ড মুহূর্ত আগে তাঁর পায়ের কি জাদুকরি রিফ্লেক্স! বলটাকে করলেন বাঁ পায়ের টোকায় লক্ষ্যভ্রষ্ট। তাতে স্পেনের শেষ আটে ওঠার পথও লক্ষ্যভ্রষ্ট।
এই স্পেনেরই ডেভিড ডি গেয়াকে বিবেচনা করা হয় বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে। এই বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে তিনি আকিনফিয়েভের ধারে-কাছেও নেই। স্পেনের চার ম্যাচে ডি গেয়ার সেভ-সংখ্যা মাত্র দুটি। বলে রাখা ভালো, সিএসকেএ মস্কোর প্রতি টান থেকেই ইউরোপের শীর্ষ সারির কোনো ক্লাবে যোগ দেননি আকিনফিয়েভ।
মস্কোকেই জীবনের ধ্যান-জ্ঞান করে নেওয়ায় আকিনফিয়েভ একটি অর্জনের দেখাও পেয়েছেন। সর্বোচ্চসংখ্যক ‘ক্লিন শিটে’ তিনি পেছনে ফেলেছেন স্বয়ং ইয়াসিনকেই! উল্লেখ্য, ইয়াসিনও খেলতেন এই সিএসকেএতেই। সাবেক সোভিয়েত আর রাশিয়ান ফুটবলে ন্যূনতম ১০০টি ‘ক্লিন শিট’ ম্যাচের রেকর্ডধারীদের এই ক্লাবে আকিনফিয়েভ শীর্ষে (২৪৫ ম্যাচ)।
সেই তালিকায় চতুর্থ ইয়াসিন—১৯৬৬ বিশ্বকাপে সোভিয়েত ইউনিয়নকে তুলেছিলেন সেমিফাইনালে। তারপর আকিনফিয়েভের দৃঢ়তায় শেষ আটে উঠে সেই পথেই হাঁটছে ‘সোভিয়েত’ নাম পাল্টে ফেলা রাশিয়া। কাল রাতে তাই আকিনফিয়েভই রাশিয়ার জয়ের ‘নায়ক’। তবে কালকের দুটি ম্যাচ বিবেচনায় নিলে রাতটা কিন্তু শুধুই গোলরক্ষককের।
ক্রোয়েশিয়া-ডেনমার্ক ম্যাচে তো দুই গোলরক্ষক নায়ক হওয়ার পাল্টাপাল্টি চেষ্টায় নেমেছিলেন। ক্যাসপার স্মেইকেল ও দানিয়েল সুবাসিচ। স্মেইকেলের ওপর প্রত্যাশার চাপটা এমনিতেই বেশি ছিল। তাঁর বাবা পিটার স্মেইকেল ডেনমার্ক ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি গোলরক্ষক। কাল রাতে নোভরোগোরাদের গ্যালারিতেও ছিলেন। স্মেইকেল জুনিয়র কি তাতে আলাদা করে চাপে ভুগেছেন? বাবার সামনে নিজের সামর্থ্যের পরীক্ষা দেখানো বলে কথা! বোধ হয় না।

অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি পেয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। সেটিও আবার ম্যাচ শেষ হতে যখন মাত্র ৪ মিনিট বাকি। তখন অনেকেই ডেনিশদের বিদায় দেখছিলেন। কিন্তু ক্যাসপার যেন কার্টুন-চরিত্র ‘ক্যাসপার’ নামের সেই ভূতই হয়ে উঠেছিলেন! ডান দিকে নেওয়া মডরিচের জোরালো স্পটকিক উড়ে গিয়ে কী অবলীলায় না ঠেকালেন! গ্যালারিতে তখন স্মেইকেল সিনিয়রের উল্লাস দেখে কে! ছেলের সেভেই তো ডেনমার্ক এই ম্যাচটা টাইব্রেকার পর্যন্ত নিতে পারল।
টাইব্রেকারে দুই দলের গোলরক্ষক যেন যুক্তি করেই নেমেছিলেন। ম্যাচটা যত দূর পারো টানার চেষ্টা করো! প্রথম দুটি স্পটকিকই সেভ। এরপর দুটি করে লক্ষ্যভেদে দুই দলের স্কোরলাইন হলো ২-২। এখান থেকে আবার নাটকীয়তার শুরু। টানা তিনটি স্পটকিক সেভ! এর মধ্যে দুটি দানিয়েল সুবাসিচের, একটি ক্যাসপারের। ক্যাসপার শেষ পর্যন্ত জয়ের মুখ না দেখলেও বাবার মুখটা উজ্জ্বল করেছেন। আর সুবাসিচ? চোখ বুজে বলে দেওয়া যায় ক্রোয়েশিয়া শেষ আটে উঠত না যদি সুবাসিচের হাত দুটো চওড়া না হয়ে উঠত।
এই দুই গোলরক্ষকের চওড়া হাতের সুবাদে কাল রাতে রেকর্ড বইয়েও ওলটপালট হয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো ম্যাচের টাইব্রেকারে পাঁচটি সেভ দেখা গেলে সুবাসিচ-ক্যাসপারের কল্যাণে। শুধু কি তাই? বিশ্বকাপে ৩২ বছর পর এই প্রথমবারের মতো একই দিনে (সূচি) দুটি ম্যাচেরই নিষ্পত্তি ঘটল টাইব্রেকারে। যেখানে গোলরক্ষকেরাই নায়ক।
অথচ এই গোলরক্ষকেরাই সূচ্যগ্র পরিমাণ ভুল করলে মুখ লুকোনোর জায়গা থাকে না! আর্জেন্টিনার উইলি কাবায়েরোর কথাই ধরুন। আকিনফিয়েভ আর সুবাসিচকে দেখে তাঁর সেই অবিশ্বাস্য ভুলের দুঃখ নিশ্চয়ই কিছুটা লাঘব হয়েছে। এক রাতে এই দুজনের ভেলকিতে গোলরক্ষকদের নিয়ে প্রচলিত একটা প্রবাদ তো অন্তত ভুল প্রমাণিত হলো, ‘গোলরক্ষকেরা ম্যাচ জেতায় না, বাঁচায়।’ নাহ্, তাঁরা জেতাতেও পারেন। কাল রাতে সবাই তা দেখেছে।