ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়ন শুধু ইমরানই করতে পারবেন: গাভাস্কার

‘তুমি এখন অবসরে যেতে পারবে না। আগামী বছরই পাকিস্তান ভারতে আসছে। আর আমি ভারতের মাটিতে ভারতকে হারাতে চাই। তুমি দলে না থাকলে আর জিতেও সেই মজা পাব না। যেয়ো না, চলো শেষবার একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ি।’ কথাগুলো পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের। এই কথাগুলো যখন বলেছিলেন তখন অবশ্য তাঁর পরিচয় ছিল অন্য কিছু—ক্রিকেটার। ১৯৮৬ সালে সুনীল গাভাস্কারের অবসর নেওয়াটা এভাবেই পিছিয়ে দিয়েছিলেন ইমরান।
দল হিসেবে ভারত-পাকিস্তান চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হলেও খেলোয়াড়দের মধ্যে যে হৃদ্যতার কোনো ঘাটতি ছিল না, এটা তা–ই প্রমাণ করে। ইমরানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন গাভাস্কার। স্মৃতি রোমন্থন করেছেন বিশেষ বিশেষ কিছু মুহূর্তের।
ভারতের ইংল্যান্ড সফর তখন প্রায় শেষের পথে। এরই মধ্যে একদিন রাতে ইতালিয়ান এক রেস্তোরাঁয় খেতে বসেছিলেন ইমরান-গাভাস্কার। গাভাস্কার অবসরের চিন্তার কথা জানাতে তাঁকে ওপরের কথাগুলো বলেছিলেন ইমরান। তখন গাভাস্কার বলেছিলেন, নতুন সিরিজের ঘোষণা দ্রুত জানানো না হলে তিনি দেশে ফিরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গন ছাড়ার ঘোষণা দিতেন। ইংল্যান্ড সিরিজ শেষ হওয়ার আগেই ভারতের মাটিতে নতুন সিরিজের ঘোষণা আসে, পাকিস্তানের বিপক্ষেই।
প্রচ্ছন্ন হুমকির ছলে বলা বন্ধুর সেই কথা ফেলতে পারেননি গাভাস্কার। ইমরানও তাঁর ‘প্রতিশ্রুতি’ রেখেছিলেন। ভারতের মাটিতে প্রথমবারের মতো ভারতকে হারিয়েছিল পাকিস্তান। অবশ্য সিরিজের শেষ ম্যাচ ছাড়া সব ম্যাচই ড্র হয়েছিল।

এরপরই দুজন লর্ডসে এমসিসির দ্বিশতবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত টেস্ট ম্যাচে একসঙ্গে খেলতে নেমেছিলেন। দুজন মিলে গড়েছিলেন ১৮২ রানের জুটি। বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া সে দলে কপিল দেব, জাভেদ মিয়াঁদাদও ছিলেন।
গাভাস্কার সে জুটির বর্ণনা দিয়েছেন, ‘মাঠে নেমেই বোলার ও মাঠ সবটাই বুঝে নিই দুজন। প্রতিটি ওভার শেষে দুজন দুজনকে উৎসাহ দিচ্ছিলাম। একসময় দুজনই দুজনকে যার যার দলের (ভারত ও পাকিস্তান) ড্রেসিংরুমের গল্প বলে হাসিতে মেতে উঠতাম। আমাদের পরিচয় তো ১৯৭১ সালে। তখন ইমরান ওরচেস্টারশায়ার কাউন্টি টিমে খেলার সুযোগ পেতে লড়ছে। তখন সে হারজিরে এক কিশোর। মিডিয়াম পেসার। বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ একেবারেই নেই। সাত বছর পর যখন টেস্ট খেলতে নামল তখন ইনসুইংয়ে দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণ, বলেও অনেক গতি।’
১৯৮২-৮৩ সালে প্রায় এক হাতেই ভারতকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ইমরান। নিয়েছিল ৪০টি উইকেট। তার কারণে সে যুগের ভারতের সেরা ব্যাটসম্যান গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপের আগেই জেতার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল অধিনায়ক ইমরান। বাজে শুরুর পরও পাকিস্তান জিততে পারে—এ বিশ্বাস থেকে টলানো যায়নি তাকে।
এরপরই ইমরানের মানবতার বিষয়টিও তুলে ধরেন গাভাস্কার। বলেন, ‘সে সময়ই (’৯২-এর বিশ্বকাপ) মায়ের স্মরণে ক্যানসার হাসপাতাল তৈরিতে লেগে পড়ে। তার মা ক্যানসারে মারা গিয়েছিলেন। হাসপাতালের জন্য পাকিস্তান ঘুরে ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করতে থাকে। তখনই টের পেয়েছিল জনসাধারণের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কোন পর্যায়ে। সম্ভবত তখনই তার ভেতরে রাজনীতির বীজ ঢুকে পড়েছিল। যখন রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিল, তখন সর্বস্ব ঢেলে দিয়েছে। কয়েকবার নির্বাচনে হারার পর এবার তার হাতেই শাসনক্ষমতা।’
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইমরানের মাথার চুল ঝরতে শুরু করে। সেই প্রসঙ্গে মজার গল্প বলেন সুনীল, ‘তখন তাকে (ইমরান) পুরি ক্লাবে নিমন্ত্রণ জানাই। ইমরান অবাক হয়ে গিয়েছিল। জানতে চেয়েছিল এই ক্লাবের মানেটা কী। তাকে বুঝিয়ে বলেছিলাম, মাথা টাক হয়ে যাওয়ায় তা দেখতে পুরির মতো হয়। তবে আমাদের মাথা যেন পরোটার মতো না হয় সে ব্যাপারেও সতর্ক করেছিলাম।’
ইমরানই পাকিস্তানের একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যে সাধারণ নাগরিক হিসেবে অনেকবার ভারতে এসেছে। শুধু যে উঁচুতলার লোকদের সঙ্গে মিশেছে, তেমনটা নয়, রাস্তায় থাকা তার ভক্তদের সংস্পর্শও পেয়েছে।
এ কারণে ইমরানের কাছে অনেক আশা গাভাস্কারের। এখন শুধু পাকিস্তানিরাই নয়, ভারতের লোকজনও দুই দেশের মধ্যকার সমস্যার সমাধান চায়। চায় নতুন চমক। ভারতের মানুষের প্রত্যাশা, তার সময় দুই দেশের মধ্যে এক বন্ধুত্বের যুগ তৈরি হবে। কারণ, যদি ইমরান এটা করতে না পারে, তবে কেউই পারবে না।
সবার শেষে বন্ধুর জন্য শুভকামনা জানিয়ে গাভাস্কার বলেছেন, ‘শুভকামনা ইমরান। খোদা তোমার সহায় হোক।’