স্বদেশি নারীর হাত ধরেই ফুটবলে আমিরাতের নারীরা

>হুরাইয়া আল তাহেরি একাধারে আরব আমিরাতের নারী ফুটবল দলের কোচ (বয়সভিত্তিক থেকে জাতীয় দল), মহিলা ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান, ফিফা কোচিং এক্সপার্ট। ৩২ বছর বয়সেই এত সাফল্যের মালিক হুরাইয়া।
আত্মবিশ্বাসী ও হাস্যোজ্জ্বল একটা মুখ। আরবের মানুষ—শুনলে চোখের সামনে যেমন ভেসে ওঠে, দেখে একদমই সে রকম মনে হবে না। ডাগআউট থেকে শুরু করে সংবাদ সম্মেলন—সব জায়গায় বাঙালি মেয়েদের মতো ঠোঁটে লিপস্টিক। নামের সঙ্গে বাঙালি একটা পদবি লাগিয়ে দিলে কারও সন্দেহ করার কথা নয়! হলরুমভর্তি বিদেশিদের মধ্যে আলাদাভাবে চেনা যায় তাঁকে। তিনি আরব আমিরাতের নারী ফুটবল দলের কোচ হুরাইয়া আল তাহেরি। তাঁর চোখেই আমিরাতবাসী দেখছে দেশের নারী ফুটবলের স্বপ্ন।
অনূর্ধ্ব-১৯ বঙ্গমাতা আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনেই কথা বলে চমক লাগিয়ে দিয়েছিলেন হুরাইয়া। টুর্নামেন্টের ফেবারিট প্রশ্নে বিদেশি পাঁচ দলের মধ্যে চার দলের কোচই একবাক্যে স্বাগতিক বাংলাদেশকে শিরোপার দাবিদার হিসেবে তুলে ধরলেও একমাত্র তিনিই বলেছিলেন, ‘খেলা শুরু হলেই বোঝা যাবে কারা ফেবারিট!’ সাহস দেখানো হুরাইয়ার দল টানা দুই ম্যাচ হেরে সবার আগে বিদায় নিয়েছে টুর্নামেন্ট থেকে। তাহলে ওটা কি শুধুই কথার কথা ছিল! ঢাকা ছাড়ার আগে হুরাইয়া বললেন, ‘কাউকে ফেবারিট বলে আমার খেলোয়াড়দের যদি আগে থেকেই আমি বুঝিয়ে দিই, টুর্নামেন্টে আমাদের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে লড়াই করার শক্তিটা হারিয়ে ফেলত তারা। তাই ফেবারিটের তকমাটা সবার ওপরেই দিয়েছিলাম।’
শুধু কথাতেই কৌশলী নন, কাজকর্মেও নিজেকে আলাদাভাবে প্রমাণ করেছেন হুরাইয়া। ঢাকা ছাড়ার আগের রাতে হোটেলের সুইমিংপুলের পাড়ে বসে প্রথম আলোকে শুনিয়েছেন ফুটবলার থেকে আরব অঞ্চলের প্রথম নারী কোচ হওয়ার গল্প। পরিচয়ের ব্যাপ্তিটা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, বর্তমানে আরব আমিরাতের নারী ফুটবল কমিটির প্রধানের দায়িত্বও তাঁর কাঁধে। এএফসি ‘এ’ লাইসেন্স কোচিং সনদ থাকা হুরাইয়া ফিফার কোচিং এক্সপার্টও। কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার বলেই ৩২ বছরেই দুই হাত ভরে ধরা দিয়েছে এত সাফল্য।
ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের পোকা হুরাইয়ার জীবনের পরতে পরতে লেখা রোমাঞ্চ ও আত্মবিশ্বাসের গল্প। দুবাইয়ে মেয়েদের ফুটবল খেলার প্রচলন না থাকায় দুই ঘণ্টার বাসযাত্রা করে আবুধাবিতে গিয়ে অনুশীলন করতেন। আবুধাবি ক্লাবের জার্সিতে খেলেছেন টানা আট বছর। শিকড়ের ক্লাব ছেড়ে নিজেই গঠন করেছেন আল ওয়াহদা ক্লাবের মেয়েদের দল। ঘরোয়াতে খেলতে পারলেও জাতীয় দলে না খেলতে পারার আক্ষেপটা পোড়াচ্ছিল তাঁকে। খেলবেন কী করে, জাতীয় দলই তো ছিল না। ২০১৩ সালে আল ওয়াহদা ক্লাবের মেয়েদের নিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়েদের জাতীয় দল গঠন করেন হুরাইয়া। তখন থেকেই তিনি একাধারে খেলোয়াড় ও সহকারী কোচ। এর পরে ২০১৭ সাল থেকে নারী ফুটবল কমিটির প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে নারী ফুটবল অবকাঠামো কীভাবে তৈরি করেছেন, গল্পটা শুনলে অবাক হতেই হবে।

২০১৫ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ খেলা এই গোলরক্ষকের কাঁধে ২০১৭ সালে আরব আমিরাতের নারী ফুটবল কমিটির প্রধানের দায়িত্ব আসে। ফুটবলের প্রতি অসীম ভালোবাসা প্রকাশের এই তো সুযোগ! এই দুই বছরে কী না করেছেন ফুটবলপাগল হুরাইয়া! তাঁর মুখ থেকেই শুনুন, ‘সিনিয়র দলের সঙ্গে অনূর্ধ্ব–১৬ ও ১৯ দল গঠন করেছি। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-১২ ও ১৬ লিগ শুরু করেছি। ২০ জন নারী ফুটবলারকে বানিয়েছি এএফসি ‘সি’ লাইসেন্স কোচ, নারী আন্তর্জাতিক রেফারিও আছেন ২ জন।’
কয়েক বছর আগেও বিলাসী জীবন ছেড়ে ফুটবল খেলার কথা ভাবতে পারতেন না আরবের মেয়েরা। ২০১৫ সালেও স্থানীয় মেয়ে ফুটবলারের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। সে সংখ্যাটা এখন প্রায় দুই হাজারের ওপরে। হুরাইয়া নিজের কাজের খতিয়ান শেষ করেই এই প্রতিবেদকের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। আপনার এখন মনে হচ্ছে তো আরব আমিরাতের দলটা এত খারাপ রেজাল্ট করল কেন? ‘হ্যাঁ’সূচক জবাব দিলেই নিজ থেকে গড়গড় করে বলে গেলেন, ‘আমার দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়েরই বয়স ১৬–এর কোঠায়। ওরা এখন শিখছে। আমার গোলরক্ষক যে এত ভুল করেছে, ওর বয়স মাত্র ১৩। আমি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করছি। রাতারাতি সাফল্যের জন্য নয়। আমরা কেবল হাঁটতে শুরু করেছি। ভবিষ্যতের দৌড়ানোর দিকে তাকিয়ে আমি।’
এই নিয়ে তিনবার বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন হুরাইয়া। হোটেল থেকে বাইরে বের হলেই প্রতিবার তাঁর চোখে পড়েছে বাংলাদেশের পরিবর্তন। কিন্তু ফুটবলের মানুষের কাছে ফুটবল নিয়েই তাঁর খটকা। প্রতিবারই তাঁকে খেলতে হয়েছে প্রায় একই দলের বিপক্ষে, ‘আমার কাছে মনে হলো তিনবারই আমি একই দলের সঙ্গে খেললাম। ২০১৬ সালে এএফসি-অনূর্ধ্ব–১৬ বাছাইয়ে যাদের বিপক্ষে খেলেছি, গত বছর অনূর্ধ্ব-১৬ দলের খেলোয়াড়ও মনে হয় তারাই ছিল। আবার অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও তারা। ভবিষ্যতের জন্য বিষয়টা আমার কাছে সুখকর নয়।’ বাংলাদেশের ফুটবলে লিগ হয় না, এই তথ্য শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন হুরাইয়া।
উন্নতি চাইলে প্রচুর ফুটবলার তৈরি করার রাস্তা খোঁজার পরামর্শ দিলেন আরব আমিরাতের নারী ফুটবলের স্বপ্নদ্রষ্টা। কারণ, তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের চিন্তা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।