মালিঙ্গাদের রান আটকানো মাশরাফিরা দেখেছেন তো?

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কাল অসাধারণ বল করেছেন লাসিথ মালিঙ্গা। ছবি: এএফপি
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কাল অসাধারণ বল করেছেন লাসিথ মালিঙ্গা। ছবি: এএফপি
>

স্বল্প সংগ্রহ নিয়েও কাল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলকে জয় এনে দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার বোলাররা। এ জয়ে দলটির পেসারদের অবদানই বেশি। বাংলাদেশের পেসাররা কালকের ম্যাচে লঙ্কান পেসারদের বোলিং দেখেছেন তো?

আড়াই শ রানও তুলতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। তুলতে পেরেছে মাত্র ২৩২। ওয়ানডে খেলার ধাঁচ পাল্টে দেওয়া ইংল্যান্ডের কাছে এই রান সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ ওভারের মামলা—এমন ভেবেছেন অনেকেই। কিন্তু ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষেও যে এমন স্বল্প পুঁজি নিয়ে জেতা যায়, কাল তা দেখিয়ে দিয়েছে শ্রীলঙ্কা; বিশেষ করে লাসিথ মালিঙ্গা। বয়স ৩৫ পার করেও কী নিখুঁত লাইন-লেংথ, আর কী ক্ষুরধার তাঁর ইয়র্কার, ফেলতেও পারেন ইচ্ছেমতো। এমন এক পেসার যদি বাংলাদেশের থাকত! সমর্থকেরা এভাবে ভাবলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ব্যাটিং অনেকেরই মন কেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্দনা চলেছে এ নিয়ে। বোলিং বিভাগ ঠিক তার বিপরীত প্রান্তে। আশাব্যঞ্জক পারফর্ম করা দূরের কথা, প্রতিপক্ষকে সেভাবে আটকে রাখতে পারছেন না বোলাররা। এখন পর্যন্ত যে পাঁচ ম্যাচে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ, তার মধ্যে চার ম্যাচেই প্রতিপক্ষ রান তুলেছে তিন শর ওপাশে।

শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রয়োজন হয় বুদ্ধিদীপ্ত আর বৈচিত্র্যময় বোলিং। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে তার অভাব থাকলেও সেটি প্রকট নয়। দলের অভিজ্ঞ বোলারদের তূণে বৈচিত্র্য একেবারে কম নেই। কিন্তু বেশির ভাগ ম্যাচেই দেখা গেছে, প্রতিপক্ষ দল আক্রমণ শুরুর আগে বোলাররা রক্ষণাত্মক মেজাজে! অথচ হওয়ার কথা উল্টো। শুরু থেকে আক্রমণ করে, মানে উইকেট নেওয়ার বল করে চাপে ফেলতে হবে প্রতিপক্ষকে। তাহলে না রানটা একটু কম হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

এমনিতে গতির ঘাটতি রয়েছে দলের পেস বিভাগে। লেগ স্পিনারও নেই, বাকি সব দলেই যা আছে অন্তত একজন করে। ইংল্যান্ডের মতো স্পিনবিরুদ্ধ কন্ডিশন আর উইকেটে ‘সহকারী’র ভূমিকা পালন করতে হয় স্পিনারদের। মূল ভূমিকাটা থাকে পেসারদের। কিন্তু স্লোয়ার, কাটারের মতো তির থাকতেও মোস্তাফিজুর রহমান আলো কাড়তে পারছেন না। পেস কমে যাওয়ায় স্লোয়ার-কাটারের মিশ্রণে ব্যাটসম্যানকে ধন্দে ফেলতে সিদ্ধহস্ত মাশরাফি বিন মুর্তজা পর্যন্ত বল করার জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। রুবেল হোসেন আর মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনও সমস্যাটির বাইরের নন। আরও এক সমস্যা হলো নতুন বলে কোনো পেসারকে এখনো স্থায়ী করা যায়নি। সব মিলিয়ে ঘরের মাঠে কিংবা বাইরে—বাংলাদেশের বোলিং বিভাগ যেন বৈচিত্র্যহীন, পরিকল্পনা থাকে প্রায় একই রকম। রক্ষণাত্মক, উইকেট নেওয়া নয় আগে রান আটকাও!

কিন্তু রান আটকালে উইকেট পড়বে, এই কৌশলের চেয়ে উইকেট নিতে পারলেই রান আটকাবে—এ কৌশল বেশি কার্যকর। কালকের ম্যাচটা হতে পারে তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। ২৩২ রান তাড়া করতে নেমেছিল ইংল্যান্ড। তাদের প্রথম চার ব্যাটসম্যানের তিনজন ফিরেছেন ৭৩ রানের মধ্যে। এর মধ্যে উইকেট পড়েছে প্রথম ওভারেই। লঙ্কানরা আক্রমণাত্মক বোলিং না করলে এমন শুরু পেত না। স্লিপ নিয়ে ব্যাটসম্যান বুঝে উইকেট নেওয়ার চেষ্টায় বল করেছেন লঙ্কান পেসাররা। অফ স্ট্যাম্প বরাবর করতে করতে কখনো পায়ে মেরেছেন, কখনো আবার ইয়র্কার, সঙ্গে স্লোয়ার-কাটার তো আছেই। গতি যা–ই হোক, বৈচিত্র্যময় আর প্রায় নিখুঁত লাইন-লেংথের পেস বোলিং ভীষণ কাজে দিয়েছে লঙ্কানদের।

ঠিক একই জায়গায় বাংলাদেশের পেসারদের কথা ভাবলে মন খারাপ হবেই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার-অ্যারন ফিঞ্চকে আটকানোর চেষ্টা করেছেন পেসাররা। কীভাবে? দুজনের পছন্দের জায়গায় বলা না করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই চেষ্টা করতে গিয়ে পেসাররা শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, প্রায় সব ম্যাচেই যেন নিজেদের পছন্দমতো জায়গায় বল করছেন! তাতে রান আটকাতে পারলে হয়তো কথাটা উঠত না, যেহেতু হয়নি তাই বেশির ভাগ সময় অফ স্ট্যাম্পের বাইরে খাটো লেংথে বল করা কিংবা ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১২৫ কিলোমিটার গতিতে বাউন্সার মারার কী উপকারিতা—সেই প্রশ্ন থাকছে। গতি থাকলেও না হয় আত্মপ্রবোধ দেওয়া যায়, ক্যাচ যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এসব সমস্যা রাতারাতি ঠিক করা যায় না। তবে খানিকটা আক্রমণাত্মক তো হওয়া যায়। সেটি হতে গিয়ে অতিরিক্ত কয়েকটা রান ছুটে গেলে খুব বেশি কি সমস্যা? রান তো এমনিতেই ছুটছে। আর দলের ব্যাটসম্যানেরা কিন্তু এখন মোটামুটি যেকোনো সংগ্রহ তাড়া করতে সক্ষম। সে ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক হলে উইকেট পড়ার সম্ভাবনা বাড়বে, সঙ্গে রানও আটকানো সম্ভব হবে। আর আক্রমণাত্মক বোলিংয়ের তো নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই। সংগ্রহ যা–ই হোক, সবার আগে নিজেদের ‘মৌলিক’ পরিকল্পনাটুকু কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ। কাল জয়ের পর মালিঙ্গা যেমন বললেন, ‘আমরা নিজেদের মৌলিক পরিকল্পনা ধরে বল করেছি। কোনো আলগা বল নয়, লাইন-লেংথ, বৈচিত্র্য আর বাউন্সার।’

বাংলাদেশের পেসারদেরও নিশ্চয়ই এমন পরিকল্পনা থাকে? নিজের সামর্থ্য বুঝে তা কাজে লাগাতে পারলেই দল বেশি উপকৃত হবে।