
চলছে ফাল্গুন মাস। বসন্তের এই মাসেই গতকাল মঙ্গলবার সকাল ছয়টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ৬২ মিলিমিটার। তিনটার পরও একটানা বর্ষণ চলছিল। ৯ ঘণ্টায় যে বৃষ্টি হয়েছে, তা গত বছরের যেকোনো দিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের চেয়ে বেশি। গত বছরের ১৫ মে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৫৯ মিলিমিটার।
খুলনায় অসময়ে দিনভর একটানা এমন বৃষ্টিতে নাগরিক দুর্ভোগ দেখা গিয়েছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। নগরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। দিনভর বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষেরা।
আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিনভর মাত্র ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। এরপর গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ আকাশ কালো করে ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়। মাত্র কয়েক মিনিটের ঝড়ে বাতাসের বেগ ছিল ঘণ্টায় ৫৬ কিলোমিটার। সঙ্গে ছিল হালকা শিলাবৃষ্টি। সাড়ে ১০টার দিকে আকাশে রোদ উঠলেও সাড়ে ১১টার দিকে আবারও মেঘ জমতে শুরু করে। এরপর ১২টার দিক থেকে একটানা বর্ষণ শুরু হয়।
কৃষি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সোমবার দিনভর যে বৃষ্টি হয়েছে, তা কৃষির জন্য ছিল খুবই উপযোগী। তবে গতকালের বৃষ্টিতে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে তরমুজের আবাদ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খুলনা আবহাওয়া কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ জানান, এখন চলছে মৌসুমি লঘুচাপ। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই লঘুচাপের প্রভাবে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এরপর এদিন বিকেল থেকে আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হতে পারে। এ সময়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ থেকে ২ ডিগ্রি কমতে পারে।
গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তায় সাধারণ মানুষের আনাগোনা খুবই কম। সকালের দিকে অফিসগামী মানুষের চলাফেরা বেশি থাকলেও দিন যত গড়াতে থাকে মানুষের আনাগোনা কমতে থাকে। পেশার তাগিদে বা জরুরি কাজে যাঁরা বের হচ্ছেন, জলাবদ্ধতার কারণে গাড়ি না পেয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
বৃষ্টিতে নগরের রয়্যাল মোড়, বাইতি পাড়া, তালতলা, শান্তিধাম মোড়, মডার্ন ফার্নিচার মোড়, পিকচার প্যালেস মোড়, পিটিআই মোড়, সাতরাস্তার মোড়, শামসুর রহমান রোড, নিরালা, বাগমারা, মিস্ত্রিপাড়া, ময়লাপোতা, শিববাড়ি মোড়, বড় বাজার, মির্জাপুর রোড, খানজাহান আলী রোড, খালিশপুর, দৌলতপুর, নতুনবাজার, পশ্চিম রূপসা, আহসান আহমেদ রোড, দোলখোলা, রূপসা স্ট্যান্ড রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, বাবুখান রোড, লবণচরা বান্দা বাজার, পশ্চিম রূপসা, খালিশপুর, দৌলতপুরসহ প্রায় সব এলাকার রাস্তায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এসব এলাকার অনেক ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। নিম্নাঞ্চলের বস্তি ঘরগুলোতে দেখা গেছে হাঁটুপানি। বন্ধ দেখা গেছে বড় বাজারসহ অভিজাত অনেক বিপণিবিতান।
নগরের মুজগুন্নী এলাকায় শিশুপার্কের সামনে প্রায় হাঁটুপানির ওপর দাঁড়িয়ে দোকানদারি করছিলেন চা-বিক্রেতা নাসির হোসেন। তিনি বলেন, ভারী বৃষ্টিতে সব তলিয়ে গেছে। উপায়ান্তর না দেখে তড়িঘড়ি করে নিচে যা ছিল, তা ওপরে তুলে রেখেছেন। এখন পানির ওপর দাঁড়িয়েই বেচাবিক্রি করছেন।
দুপুরের দিকে মুজগুন্নী এলাকার বাস্তুহারা কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সব ছোট-বড় সড়কই পানিতে তলিয়ে আছে। কলোনির বাসিন্দা ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিক আনোয়ার হোসেন বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই কলোনির সব সড়ক তলিয়ে যায়। খাল ও নালাগুলো দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করায় পানি নামতে দেরি হয়। এ কারণে এলাকায় প্রায়ই জলাবদ্ধতা থাকে।
দুপুর পর্যন্ত নগরে ছিল কমসংখ্যক ইজিবাইক ও রিকশা। ইজিবাইকের চালক মিলন সরকার বলেন, ইজিবাইক নিয়ে একটু বেশি পানির মধ্যে গেলেই মোটরে পানি উঠে নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে বৃষ্টির মধ্যে সাধারণত কেউ ইজিবাইক নিয়ে বের হতে চান না। তা ছাড়া রাস্তায় মানুষের সংখ্যাও অনেক কম।
দেখা গেছে, যেসব সড়কে বেশি পানি জমেছে, সেসব সড়কে খুব কমসংখ্যক ইজিবাইক চলাচল করছে। ফলে মানুষ পানির মধ্যে হেঁটে অথবা রিকশা নিয়ে যাতায়াত করছে। কিন্তু রিকশার সংখ্যাও ছিল অনেক কম।
বেলা দুইটার দিকে ডাকবাংলো মোড়ের সামনে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. শাহজাহান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কাজ শেষ, তাই বাসায় ফিরব, কিন্তু কোথাও কোনো রিকশা পাচ্ছি না। দু-একটা পেলেও তারা নিরালার দিকে যেতে চাচ্ছে না। আবার এতটুকু পথ যেতে ভাড়াও দাবি করছে অনেক বেশি।’
কৃষি অধিদপ্তর খুলনার উপপরিচালক পঙ্কজ কান্তি মজুমদার বলেন, অসময়ে ভারী বৃষ্টিতে কিছু সুবিধা থাকলেও অসুবিধার পরিমাণ কম নয়। বিশেষ করে এই সময়ের ফসল গম, আলু, মসুর, তরমুজের চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই আবহাওয়ার সঙ্গে ভারী কুয়াশা পড়লে আমের মুকুলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বোরো ধান চাষে বৃষ্টিটা খুবই দরকার ছিল। বিশেষ করে গত বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় ধানের সেচে সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। এখন ওই সমস্যা অনেকটা কমে যাবে। তা ছাড়া বৃষ্টিতে জমির লবণাক্ততাও কেটে যাবে বলে তিনি মনে করেন।