ইট তৈরি করতে গিয়ে ফসলি জমির বারোটা

ধানে ভরপুর জেলার নাম দিনাজপুর। কথাটিতেই লুকিয়ে আছে দিনাজপুর জেলার মাটির উর্বরতা। শুধু ধান নয়, একই জমিতে বছরে তিন রকমের ফসলের আবাদ হয় এই অঞ্চলে। কিন্তু উর্বর এই তিন ফসলি জমির ওপরের অংশ (টপ সয়েল) কেটে নিয়ে  ইটভাটায় ইট তৈরি করা হচ্ছে। ফলে মাটি হারাচ্ছে উর্বরতা শক্তি, কমে যাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা। ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে পরিবেশ।

সম্প্রতি দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার বেকীপুল বাজার, বড়গ্রাম, বসন্তপুর, ভোলানাথপুর, মর্তমণ্ডল, পূর্বমহাজনী পাড়া, চক্রবর্তীপাড়া, খোচনা, মোস্তফাপুরসহ বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমন ধান কাটা শত শত বিঘা জমির উপরিভাগ আধা ফুট থেকে এক ফুট, অনেকাংশে তার চেয়েও বেশি গভীরতায় মাটি কেটে ট্রলিতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পার্শ্ববর্তী ইটভাটাগুলোতে।

কৃষান বাজার এলাকায় মেসার্স রফিক এন্টারপ্রাইজ ইটভাটা। ভাটায় ক্রয়কৃত বিশাল বড় বড় মাটির ঢিবি। ইটভাটার ব্যবস্থাপক মো. জাকের আলী বলেন, ‘আমরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে মাটি কিনি না। গাড়ির মালিক কোথা থেকে মাটি নিয়ে আসে, আমরা তা–ও জানি না। প্রতি ট্রলিতে ৭০-৭৫ ঘনফুট মাটি আসে। ট্রলিপ্রতি গাড়ির মালিককে ৫০০ টাকা দেওয়া হয়।’

ট্রলির মালিক উপজেলার কারেন্টের হাট এলাকার মতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা নিজে থেকে কৃষকদেরকে মাটি বিক্রি করতে বলি না, তারা নিজেরাই আমাদের খুঁজে নেয়। উঁচু জমি, পানি থাকে না, এ জন্য মাটি কেটে খাল করে নেয় জমির মালিকেরা।’ তিনি আরও জানান, প্রতি বিঘায় তিন ফুট গভীরতায় মাটি কাটার জন্য জমির মালিককে দেওয়া হয় ৩০-৩৫ হাজার টাকা এবং এক ফুট গভীরতায় মাটি কাটলে দেওয়া হয় ১৫-২০ হাজার টাকা। এক ফুট গভীরতায় এক বিঘা মাটিতে ১২০-১৫০ ট্রলি পর্যন্ত মাটি সংগ্রহ করে বলেও জানান তিনি। অথচ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩–এর ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে তা ব্যবহার করতে পারবে না। এই আইন লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধানও রয়েছে সেই আইনে।

বেকীপুল বাজার এলাকায় মাটি বিক্রিকারী শম্ভুনাথ বিশ্বাস জানান, পাশের জমির মাটি অন্যজনে বিক্রি করেছে। ফলে বোরো আবাদে জমিতে পানি ধরে রাখার জন্য জমিটা খাল করে নিতে হচ্ছে। শম্ভুনাথের মতো অনেকেই উঁচু জমি সমান করার জন্য মাটি বিক্রি করলেও অনেকে একসঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকার লোভেও ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে চলেছে। আর ভাটার মালিক ও জমির মালিকের সঙ্গে মধ্যস্থতা করে চলেছেন মতিয়ারের মতো ট্রলির মালিকগুলো।

দিনাজপুর মৃত্তিকা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ মামুন আল আহসান চৌধুরী ও চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘যেকোনো উদ্ভিদের মৌলিক খাদ্য উপাদান মোট ১৬টি। যার তিনটি উপাদান উদ্ভিদ বাতাস থেকে সংগ্রহ করে এবং ১৩টি উপাদান সংগ্রহ করে মাটি থেকে। আর এই ১৩টি উপাদান সঞ্চিত থাকে মাটির উপরিভাগের ১-৬ ইঞ্চি গভীরতায়। দিনাজপুরের মাটিতে ইতিমধ্যে ১৩টি উপাদানের মধ্যে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরন, ম্যাগনেশিয়াম, জৈব পদার্থসহ মোট ৯টি উপাদানের সংকট দেখা যাচ্ছে বলেও জানান তাঁরা। তাঁরা বলছেন, জমির উপরিভাগের মাটি এভাবে কেটে নেওয়ার ফলে সেই জমি আগের অবস্থায় ফিরে আসতে ২০ বছরের অধিক সময় লাগে। ভবিষ্যতে ২০-৩০ শতাংশ হারে ফসল উৎপাদন কমে যাবার আশঙ্কাও করেন তাঁরা।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই জেলায় মোট ইটভাটা রয়েছে ২৫২টি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় রয়েছে ২৬টি, বীরগঞ্জ উপজেলায় ২৯টি, হাকিমপুরে ১টি, বিরলে ১৭টি, খানসামায় ৬টি, নবাবগঞ্জে ৩৩টি, বিরামপুরে ১০টি, পার্বতীপুরে ৪৩টি, কাহারোলে ৮টি, ঘোড়াঘাটে ৮টি, বোচাগঞ্জে ২১টি, ফুলবাড়ীতে ১১টি এবং চিরিরবন্দর উপজেলায় ইটভাটার সংখ্যা ৩৯। আর এই ভাটাগুলোর প্রতিটিতে ভাটা মৌসুমে ৫-৬ বার আগুন দেওয়া হয়। প্রতিবার গড়ে ৬-৭ লাখ ইট পোড়ানো হয়।

উপজেলার এএসবি ভাটার মালিক আবদুস সামাদ বলেন, ‘সরকারের নিয়ম মেনে সব ধরনের ভ্যাট ট্যাক্স প্রদান করে প্রতি হাজার ইট বিক্রি করি ৭ হাজার ২০০ টাকা দরে। অন্যদিকে যারা ভ্যাট ট্যাক্স দেয় না তারা বিক্রি করছে প্রতি হাজার ইট ৬ হাজার ৮০০ টাকা দরে। দিন শেষে সরকারের আইন মানতে গিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি আমরা যারা নিয়মিত ভ্যাট দিচ্ছি।’

এ প্রসঙ্গে চিরিরবন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী বলেন, ‘চিরিরবন্দর উপজেলার ৩৯টি ভাটার মধ্যে অধিকাংশেরই কাগজপত্র ঠিক নেই। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। কিন্তু হাইকোর্টে তারা রিট করেছে এবং সেই রিটের কপি তারা দাখিল করেছে আমাদের কাছে। হাইকোর্টের ওপরে আমাদের করার কিছু থাকে না।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র–সংক্রান্ত বিষয়ে মুঠোফোনে বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘অধিকাংশ ইটভাটারই পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদন নেই। অবৈধ এই ইটভাটা বন্ধ করার জন্য আমরা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করছি। যাদের লাইসেন্স নেই, তাদের কাছে ইতিমধ্যে ইটভাটা বন্ধ করার জন্য চিঠি পাঠিয়েছি। সেই সাথে প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসক মহোদয়কে পত্র প্রেরণ করে অনুরোধ করা হয়েছে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।’

এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম বলেন, দিনাজপুর জেলায় মোট ১৭৪টি ইটভাটার লাইসেন্স আছে। চলতি বছরে লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছিল ৯০টি ইটভাটা। তার মধ্যে ৩৫টি ইটভাটার লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকায় অন্যদের নবায়ন দেওয়া হয়নি। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ না হবার বিষয়ে তিনি বলেন, আদালতে তারা রিট করেছে এবং সেই রিটের কপি দাখিল করার কারণে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাচ্ছে না।