default-image

বেসরকারি এয়ারলাইনস ব্যবসা এখন কেমন?

আবদুল্লাহ আল মামুন: দেশে বেসরকারি খাতের এয়ারলাইনস ব্যবসা যাত্রা শুরুর পর থেকেই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এভিয়েশন বাজারের আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো প্রায় দখল করেই নিয়েছে। সেখানে ভাগ বসানোর জন্য বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এর মধ্যে করোনা এসে সব লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। করোনার কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের এভিয়েশনশিল্প চরমভাবে বিপর্যস্ত। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সবাই রীতিমতো যুদ্ধ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও ভিসা জটিলতার কারণে আকাশপথে যাত্রীসংকট চলছে। অনেক দেশ এখনো আকাশপথ উন্মুক্তই করেনি। সব মিলিয়ে সংকট সহজে পিছু ছাড়ছে না।

দেশে এভিয়েশন ব্যবসা শুরুর দিকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নামলেও তারা সফল হতে পারেনি। তারা কেন টিকে থাকতে পারল না?

আবদুল্লাহ আল মামুন: গত শতাব্দীর শেষ দিকে এভিয়েশন বেসরকারি এয়ারলাইনস যাত্রা শুরু করে। অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইনস, এয়ার পারাবাত, জিএমজি এয়ারলাইন, বেস্ট এয়ার, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, নভো এয়ার, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি এয়ারলাইনস কর্মকাণ্ড শুরু করেছিল। বর্তমানে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ও নভো এয়ার ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে। রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ফ্লাইট চালানো স্থগিত রেখেছে। অন্য এয়ারলাইনসগুলো বিভিন্ন কারণে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছে।

এভিয়েশন ব্যবসায় এলে অর্থের আধিক্য থাকতে হয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, এয়ারক্রাফট কেনা, রুট পরিকল্পনা, অভিজ্ঞ লোকবল থাকাটা খুব জরুরি। সেই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সঠিক নির্দেশনারও প্রয়োজন আছে। বিভিন্ন চার্জ বিশেষ করে অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ, জেট ফুয়েল খরচসহ বিভিন্ন খরচ, এয়ারক্রাফট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হ্যাঙ্গার ফ্যাসিলিটি থাকা উচিত। দুই দশক ধরে বেসরকারি এভিয়েশন খাতকে এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে বর্তমান অবস্থায় এয়ারলাইনস ব্যবসায় টিকে থাকবে কী করে?

আবদুল্লাহ আল মামুন: এয়ারলাইনস ব্যবসায় টিকে থাকার মূলমন্ত্র হচ্ছে যাত্রীদের আস্থা আর সঠিক পরিকল্পনা। সঠিক পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হলে কিংবা যাত্রীদের আস্থা অর্জন করতে না পারলে কোনো এয়ারলাইনস কোনোভাবেই ব্যবসায় টিকে থাকতে পারবে না।

করোনার আগপর্যন্ত আপনাদের ব্যবসা কেমন ছিল?

আবদুল্লাহ আল মামুন: যাত্রীদের আস্থা আর বহরে নতুন নতুন এয়ারক্রাফট সংযোজনের মাধ্যমে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস সব কটি অভ্যন্তরীণ ও আটটি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছিল। ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, ৬টি নতুন এটিআর ৭২-৬০০ ও ৩টি ড্যাশ৮-কিউ ৪০০সহ ১৩টি এয়ারক্রাফট দিয়ে ইউএস-বাংলার বিমানবহর সাজানো হয়েছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশি কোনো এয়ারলাইনস চীনের কোনো গন্তব্যে প্রথমবারের মতো ফ্লাইট পরিচালনা করে। এটা ইউএস-বাংলার জন্য ব্যবসায়িক মাইলফলক ছিল। ঢাকা থেকে গুয়াংজু ও ভারতের চেন্নাই, কলকাতা, মাসকাট, দোহা, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর ও ব্যাংককে প্রতিদিন ফ্লাইট পরিচালনা করছিল ইউএস-বাংলা। করোনা মহামারিতে সবকিছু স্থবির হয়ে গেছে।

করোনা পরিস্থিতির পরের অভিজ্ঞতা কী?

আবদুল্লাহ আল মামুন: একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি বলতে পারি, বর্তমান পরিকল্পনাই ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে পারে। করোনা আমাদের যা শিখিয়ে দিয়ে গেছে, যেকোনো পরিকল্পনাই সেভাবে সাজানো উচিত। আরও শিখিয়েছে পরনির্ভর না হয়ে স্বনির্ভর হওয়ার মন্ত্র। এভিয়েশন ব্যবসায় প্রথমেই যাত্রীর আস্থা অর্জন করতে হবে। পরিকল্পনা না করে কোনো ব্যয় করা যাবে না।

করোনা শুরুর পর ব্যবসায় কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?

আবদুল্লাহ আল মামুন: ভিসা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে সীমিত পরিসরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, দোহা, মাসকাট ও গুয়াংজুতে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। অভ্যন্তরীণ রুটে সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রীদের সেবা দিতে হচ্ছে। টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করছে ইউএস–বাংলা।

সামনে এগিয়ে যাওয়ার কী পরিকল্পনা?

আবদুল্লাহ আল মামুন: দেখুন, এখন সবাই তাকিয়ে আছে ভ্যাকসিনের দিকে। করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলে মানুষের মধ্যে যে আস্থার সংকট আছে, তা কেটে যাবে। এরপরই মানুষ আবার স্বাভাবিক কর্মজীবনে যেতে পারবে। সব পরিস্থিতি মাথায় রেখেই ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পরিকল্পনা আছে, বিশেষ করে দুবাই, আবুধাবি রুটে ফ্লাইট শুরুর পরিকল্পনা করছি আমরা। এ ছাড়া কলম্বো-মালে নিয়েও ভাবছি। বহরে নতুন এয়ারক্রাফট ও সংযোজনের কথাও মাথায় আছে আমাদের।

বিজ্ঞাপন

এখন যে অবস্থা দেখছেন, তাতে বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইনস খাতের ভবিষ্যৎ কী?

আবদুল্লাহ আল মামুন: বেসরকারি এভিয়েশন খাতের অগ্রযাত্রা প্রায় ২৫ বছরের। কিন্তু এত দীর্ঘ যাত্রায় প্রাপ্তি খুব বেশি নয়। এত দিনেও এভিয়েশন খাত শিল্পে পরিণত হতে পারেনি। বর্তমানে মাত্র দুটি বেসরকারি বিমান সংস্থা টিকে আছে। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দরকার। বাংলাদেশের বাজার তুলনামূলকভাবে বড়। যে কারণে বিশ্বের প্রায় নামীদামি এয়ারলাইনস বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করে। তবে বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশই বিদেশি এয়ারলাইনসের হাতে। আমি মনে করি, বিদেশি এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বাড়াতে হলে সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দরকার। তা না হলে এ খাত সহজে হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

প্রথম আলো: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আবদুল্লাহ আল মামুন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য পড়ুন 0