default-image

১৯৯৮ সালে প্রথম আলো যখন বের হবে, তখন আমরা ছিলাম তরুণ। আমাদের সম্পাদক মতিউর রহমানও ছিলেন মধ্যপঞ্চাশ। আমরা জানতাম, আমরা একটা খবরের কাগজ বের করতে যাচ্ছি, সেই কাগজটা হবে দেশের এক নম্বর কাগজ, রঙিন হবে এর পাতা, আর এতে রোজ থাকবে রঙিন ক্রোড়পত্র। বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ আর স্বাধীন কাগজ হবে প্রথম আলো—সেই লক্ষ্য তো ছিলই।

কিন্তু আরও একটা লক্ষ্য ১৯৯৮ সালের সেই শুরুর দিনগুলোতে প্রত্যেক কর্মীর মনে টগবগ করে ফুটত, তা হলো, সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে আমরা দেশের সেবা করতে চাই, মানুষের পাশে থাকতে চাই, সমাজের নানা অসংগতি দূর করতে চাই, আর তরুণ পাঠকদের সামনে উচ্চতর আদর্শবোধ, শ্রেয়োবোধ তুলে ধরতে চাই। প্রথম আলোর কর্মীরা কেউ তাঁদের কাজটাকে নয়টা-পাঁচটা চাকরি হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন ভালোর সাথে, আলোর পথে দেশটাকে একটুখানি এগিয়ে নেওয়ার মিশন হিসেবে। তাই ছাপা কাগজ ও অনলাইন প্রকাশনার বাইরে প্রথম আলোর নানা সামাজিক কাজ আর প্রকাশনার সক্রিয়তা রোজ আমাদের চোখ পড়ে।

বিজ্ঞাপন

কিশোর আলো থেকে প্রথমা

দেশের জনসংখ্যার সিংহভাগ তরুণ। তরুণেরা যদি আলোকিত হয়, আলোকিত হবে ভবিষ্যৎ। প্রথম আলো তাই তরুণদের হৃদয়ে হৃদয়ে ছুঁয়ে দিতে চায় আলোর পরশমণি।

প্রথম আলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আছে কিশোর আলো, বিজ্ঞানচিন্তা, প্রথমা প্রকাশন। আছে চলতি ঘটনাপ্রতিচিন্তাকিশোর আলো ৭ বছর পেরোল, প্রথম সংখ্যাতেই তা জয় করে নেয় হাজার হাজার কিশোরের মন। কিশোরেরা সাহিত্য পড়ছে, বইয়ের জগৎ কিংবা জ্ঞান–বিজ্ঞানের জগতের খবর পাচ্ছে, নিজেরা লিখছে, আঁকছে। কিআ বুক ক্লাব বা ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি ক্লাবের মাধ্যমে নিজেদের মেধা-মননকে করছে শাণিত।

বিজ্ঞান নিয়ে একটা মাসিক ম্যাগাজিনও যে তরুণ পাঠকদের চিত্ত জয় করে চিন্তার রাজ্যে আলোক সঞ্চার করতে পারে, বিজ্ঞানচিন্তা বের হওয়ার আগে তা কে ভেবেছিল! চলতি ঘটনা নতুন, কিন্তু এরই মধ্যে তা শিক্ষার্থী ও জীবন গড়তে মাঠে নামা যুবকদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠতে শুরু করেছে। গুরুতর জাতীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ে মননশীল চিন্তামূলক লেখার জন্য আছে প্রতিচিন্তা

প্রথমা প্রকাশন প্রায় প্রতিবছরই বাংলা একাডেমি বইমেলা থেকে পায় ভালো বই প্রকাশের পুরস্কার, আর এর লেখকেরা জয় করে নেন দেশের বিভিন্ন সাহিত্য পুরস্কার। মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান নিয়ে মননশীল বা গবেষণামূলক বইয়ের খোঁজে যেমন পাঠক প্রথমার কথাই ভাবেন প্রথমে, তেমনি সাম্প্রতিক সাহিত্যের স্বাদ নিতেও ওলটাতে হয় প্রথমার বই-ই। প্রবন্ধ, জীবনী, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাসের পাশাপাশি গল্প–কবিতা–উপন্যাসের বই প্রকাশ করে প্রথমা দেশের প্রকাশনাজগতে সমীহ অর্জন করে নিতে পেরেছে।

প্রথম আলো ছাপা কাগজ, অনলাইন, ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউব—সবখানেই থাকে একটু আলো ছড়ানোর চেষ্টা, ভালোর পাশে থাকার অভিপ্রায়। পাঠকদের একটু অনুপ্রাণিত করা, তাদের চেতনা, মনন ও হৃদয়ে একটুখানি উৎকর্ষের স্পর্শ দেওয়ার প্রয়াস কি কাগজে, কি প্রথমার বইয়ে, কি বর্ণিল নামের ম্যাগাজিনে, কি ফেসবুকের লাইভ সাক্ষাৎকারে খুবই স্পষ্ট। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জাহিদ হাসান, কোয়ালিটি গুরু সুবীর চৌধুরী, অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ, গ্রামীণ ফোনের সিইও ইয়াসির আজমানের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয় প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে, প্রকাশিত হয় ছাপা কাগজে আর অনলাইনে।

গণিত অলিম্পিয়াড থেকে বিয়ে উৎসব

প্রথম আলো কেবল একটা সংবাদমাধ্যম নয়, এটা একটা বিশ্বাস, একটা আলোর অভিযাত্রা। রোজ কাগজ বের করতে হয়, অনলাইনে প্রতি ঘণ্টায় সর্বশেষ খবর আর বিশ্লেষণ প্রকাশ করতে হয়, তা তো আছেই। এর বাইরে প্রথম আলো আরও কত বিচিত্র অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে, তার তালিকার দিকে একটু নজর দিলেই কথাটার তাৎপর্য খানিকটা বোঝা যাবে। গণিত অলিম্পিয়াড, তারুণ্যের জয়োৎসব, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান জয়োৎসব, প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা, কৃষি পুরস্কার, প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন প্রতিযোগিতা, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, বর্ষসেরা বই পুরস্কার, বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ পুরস্কার, নারী দিবস পালন এবং বিয়ে উৎসব।

গণিত অলিম্পিয়াড থেকে শিক্ষার্থীরা যায় আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে, সোনার মেডেল, রুপার মেডেল, ব্রোঞ্জ মেডেল নিয়ে আসে দেশে। আমাদের মাথা উঁচু হয়, বুক ভরে ওঠে। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারকে মনে করা হয় বাংলাদেশের সংস্কৃতিজগতে পুরস্কারের সবচেয়ে বড় আয়োজন। বর্ষসেরা বই কিংবা বর্ষসেরা ক্রীড়া পুরস্কার যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের অনেকেই দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন, ওই আকাশে উজ্জ্বল তারা হয়ে আলো দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

একনজরে প্রথম আলো ট্রাস্ট

দুস্থ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, দেশ থেকে অ্যাসিড-সন্ত্রাস কিংবা মাদকের অভিশাপ দূর করার মতো কাজে প্রথম আলো নিয়োজিত আছে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। প্রথম আলো ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে (২৩ মে, ২০০৯) এসব উদ্যোগ পেয়েছে আরও সংহত রূপ। ট্রাস্টের নানা কার্যক্রম চলে প্রায় বছরজুড়েই।

নারীদের ওপর অ্যাসিড-সন্ত্রাস বন্ধে সংবাদপত্রের শক্তিকে কাজে লাগানোর উদাহরণ সৃষ্টি করে ২০০৫ সালে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান র​্যামন ম্যাগসেসাই পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কারের ৩৩ লাখ টাকা সমান তিনটি ভাগে অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের জন্য, মাদকবিরোধী আন্দোলন ও নির্যাতিত সাংবাদিক সহায়তা তহবিলে বরাদ্দ করে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুেত প্রথম আলোর কর্মীরাও তাঁদের বেতন থেকে অনুদান দিয়ে যুক্ত হন এ সামাজিক কার্যক্রমে।

প্রথম আলো ২০০৭ সাল থেকেই শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে আসছে। ব্র্যাক ব্যাংক ও অন্য দাতাদের সহযোগিতায় ৯৪২ জন শিক্ষার্থী সহায়তা পেয়েছে অদম্য মেধাবী কর্মসূচির মাধ্যমে। প্রতিবছর সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের প্রথম নারী এ রকম ১০ জনকে বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে, তারা পড়ছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন চট্টগ্রামে। সামিট গ্রুপের সহযোগিতায় প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় দুর্গম এলাকায় ছয়টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

দেশের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য গঠিত হয়েছে ত্রাণ তহবিল। সিডর, আইলা, আম্পান, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে অথবা শীতার্ত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় প্রথম আলো। সর্বশেষ আম্পান, বন্যাদুর্গতদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায়। এ বছর প্রায় এক কোটি টাকার ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে প্রথম আলো ট্রাস্ট ও বন্ধুসভার মাধ্যমে।

রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য তহবিল গঠন করে ১০১ জনের মধ্যে ১ কোটি ১ লাখ টাকা এককালীন বিতরণ করা হয়। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার শিকার পরিবারের ২০ জনের সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে।

নরসিংদী জেলার রায়পুরায় এনভয় গ্রুপের সহযোগিতায় ২০১৫ সাল থেকে প্রথম আলো ট্রাস্ট-সাদত স্মৃতি পল্লী প্রকল্পের কাজ চলছে। গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষকে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে এ প্রকল্পের আওতায়।

প্রথম আলো বন্ধুসভা

প্রথম আলোর তরুণ পাঠকেরা গড়ে তুলেছেন একটা অনন্য সংগঠন—বন্ধুসভা। সারা দেশে জেলা, উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে শতাধিক বন্ধুসভা। দেশব্যাপী বন্ধুসভার ৮৫ হাজার সদস্য নিজেকে আলোকিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশ ও সমাজের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অধ্যয়নচক্র, সাহিত্য-শিল্প-আবৃত্তি-বিতর্ক-সংগীত-সংস্কৃতির চর্চা, ম্যাগাজিন প্রকাশ, স্বাধীনতা দিবস-একুশে ফেব্রুয়ারি-বিজয় দিবস-নববর্ষ পালন, কবি-সাহিত্যিক মনীষীদের জন্ম-মৃত্যুদিবস পালন, বৃক্ষরোপণ, নানা ধরনের মানসিক উৎকর্ষের জন্য কর্মশালা, এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করা, মানবিক কিংবা সামাজিক প্রয়োজনে সাড়া দেওয়া, ত্রাণকাজ—সারা দেশে বন্ধুসভার এ ধরনের কার্যক্রম সারা বছর ধরেই আলোকঝরনার মতো প্রবাহিত হতে থাকে।

সংবাদপত্রের চেয়ে একটু বেশি

প্রথম আলোর বন্যা ত্রাণ তহবিলে সাহায্য করার জন্য স্কুলের শিশু টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে চলে এসেছে প্রথম আলো অফিসে। বুয়েটের ছাত্র আতিকুল হক হৃদয় ক্যানসারে আক্রান্ত, চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। আমরা লিখলাম প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায়। মানুষের একটু একটু করে দেওয়া সাহায্যে জমা টাকার পরিমাণ কোটি ছাড়িয়ে গেল।

দেশের উত্তরাঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিক মাসে মঙ্গা হয়, খাদ্যাভাব দেখা দেয়। প্রথম আলো বন্ধুসভার মাধ্যমে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য ত্রাণ নিয়ে ছুটছে। কিন্তু তাই কি যথেষ্ট! এই মঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই। প্রথম আলো কুড়িগ্রামে চলে গেল গোলটেবিল বৈঠক করতে। দেশের নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিলেন সেই গোলটেবিলে। স্থানীয় মানুষেরা জানালেন কী কী করণীয়। ঢাকায়ও আয়োজিত হলো একাধিক আলোচনা সভা। আজকে দেশের উত্তরাঞ্চলে সেই তীব্র খাদ্যাভাবটা আর নেই। যা করার সরকার করেছে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করেছে। প্রথম আলো শুধু নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

প্রথম আলো নানা জাতীয় ইস্যুতে নিয়মিত আয়োজন করে থাকে গোলটেবিল। বড় বড় অনেক সমস্যার সমাধানে বাস্তব পদক্ষেপের সূচনা করার পেছনে নিশ্চয়ই সেসব গোলটেবিল বৈঠকের কিছু না কিছু অবদান থাকে। করোনাকালে গোলটেবিল আয়োজন থেমে নেই, অনুষ্ঠিত হচ্ছে অনলাইনে।

প্রথম আলো তাই শুধু একটা খবরের কাগজ নয়, এটা দেশের বৃহত্তম গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং এটা সংবাদপত্রের চেয়ে একটু বেশি। একটু কথাটা হয়তো একটু বেশি বিনয় করেই বলা।

কিন্তু বিনয়ও প্রথম আলোর একটা ঘোষিত নীতি। প্রথম আলোর কর্মীদের সব সময় মনে করিয়ে দেওয়া হয়, বিনয়ী থাকতে হবে, উদ্ধত হওয়া চলবে না। প্রথম আলোর ২২ বছরকে তাই হয়তো বিনম্র ২২-ও বলা যায়।


আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক

মন্তব্য পড়ুন 0