যুদ্ধে সাধারণ মানুষের জীবনসংশয় হলেও সুবিধাবাদীদের ব্যবসা বেড়ে যায় বহুগুণ। তাঁদের উসকানিতে যুদ্ধ প্রলম্বিত হয়। ইউক্রেন-রাশিয়ার ক্ষেত্রেও তা–ই হচ্ছে। বৈশ্বিক ‘গ্যাঞ্জাম’ নিয়ে লেখা ওপরের গানটি বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ মানিয়ে যায়। গানটি প্রায় ৩৮ বছরের পুরোনো। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়ার আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বগুড়া ইয়ুথ কয়্যার’–এর গানটি লেখা হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। বিশ্ব তখন স্নায়ুযুদ্ধে নাকাল।

আঞ্চলিকতার বেড়া ডিঙিয়ে দেশময় ছড়িয়ে এখন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও স্থান করে নিয়েছে বগুড়া ইয়ুথ কয়্যার। এখানেই সার্থকতা দেখেন সংগঠনটির প্রাণপুরুষ তৌফিকুল আলম। বগুড়ার ছোট-বড় সবার কাছে যিনি ‘টিপু ভাই’। বয়স ৭০ পেরিয়েছে। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ইয়ুথ কয়্যারের হাল ধরে আছেন টিপু ভাই। তাঁর নাম আর ইয়ুথ কয়্যার আজ সমার্থক হয়ে উঠেছে।

১৯৬০–এর দশকে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তৌফিকুল আলম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উদীচীতে যোগ দেন। দল বেঁধে গ্রামে গ্রামে গাইতেন গণসংগীত। তাঁর মুখেই জানা যাক ইয়ুথ কয়্যারের শুরুর কথা, ‘আমার মনে হচ্ছিল পরিবর্তন ও প্রগতির যেসব কথা, সামাজিক অনাচারের যেসব বার্তা আমরা মানুষের কাছে দিতে চাচ্ছি, তার ভাষা ঠিক হচ্ছে না। মনে হচ্ছিল মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে তাদের ভাষায় কথা বলা লাগবে। তখনই হলো ইয়ুথ কয়্যার, বয়সে সবাই তখন তরুণ।’ এখন পর্যন্ত সংগঠনটির প্রায় হাজার গানের স্রষ্টা তিনি। প্রতিটি গানের মধ্যে থাকে সমাজের অসংগতির চিত্র আর তার কৌতুকপূর্ণ উপস্থাপন। শুরুর গানটিই ধরা যাক। সত্তরের দশকে জিনিসপত্রের দাম চর চর করে বাড়তে থাকে। সেই সময় বগুড়ার শেরপুরের বিখ্যাত দইয়ের দাম ১ টাকা ২৫ পয়সা থেকে এক লাফে ৫ টাকায় ওঠে। টিপু বললেন, ‘এই দাম বেড়ে যাওয়া নিয়া লিখা ফেললাম “গোবরা খ্যায়া যা শেরপুরের দই, পাঁচ শিকা আচল এখন পাঁচটেকায় লই।” এ গান দিয়্যাই কিন্তু শুরু হলো আমাদের।’

আঞ্চলিক ভাষায় গান গেয়ে একটি সংগঠনের চলা ও টিকে থাকা কিন্তু যথেষ্ট কঠিন ছিল। খোদ বগুড়ার অনেকেই এ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন, কেউ কেউ সমালোচনাও করতেন। টিপু বললেন, ‘সমালোচকদের কথা ছিল, হামি-তুমি, কুটি এসব “অমার্জিত” ভাষায় আবার গান হয় নাকি। এসব নাকি মানুষ পছন্দ করবে না। কিন্তু এলাকার মানুষ তো পছন্দ করলই, সারা দেশে আমাদের নাম ছড়াল।’ আজও বগুড়ার কোনো মানুষ ভিন্ন এলাকার কারও সঙ্গে পরিচিত হলে ‘ও আপনি তো বোগড়্যার ছোল’—এমন কথা শুনতে হয়। ইয়ুথ কয়্যারের একটি গান ‘হামরা বগুড়ার ছোল, পুঁটি মাছ মারবার য্যায়া মারে আনি বোল’, আজও অমলিন। অধুনা ফেসবুক বা ইউটিউবের কল্যাণে ভাইরালও বটে।

সত্তর-আশির দশকে ইয়ুথ কয়্যারের সময় তো আজকের মতো এত কিছু ছিল না। সাদা-কালো বিটিভিই তখন একমাত্র ভরসা। এই বিটিভিতে অনুষ্ঠান করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ইয়ুথ কয়্যারের খ্যাতি। অনেক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষা না বুঝলেও এসব গানের মধ্যে যে সর্বজনীনতা ছিল, তাই মানুষকে টানত। যেমন দরিদ্র ও অসহায় নারীকে নিয়ে ‘হামি বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতাত এডা কেনডিডেট পাঠামু, নাম শুকিমন’, বহুবিবাহের বিরুদ্ধে ‘ক্যারে বড় বউ তুই ঘুমত থ্যাকে উঠিস না ক্যারে’, শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত ‘দেবদাস’–এর কৌতুকপূর্ণ উপস্থাপন, ঢাকার যৌনপল্লি কান্দুপট্টির যৌনকর্মীদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ‘ভালো হছে কান্দুপট্টির মানুষগুলাক খেদা দিয়া ভাই’ গানগুলো তুমুল জনপ্রিয় হয়। সাপ্তাহিক বিচিত্রাও বগুড়া ইয়ুথ কয়্যার নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছিল। তবে এই সংগঠন বা এর সংগঠক তৌফিকুল আলম, কেউই আজ পর্যন্ত কোনো জাতীয় স্বীকৃতি পাননি। অনেকেই একে দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করেন। তবে জাতীয় পর্যায়ের কোনো স্বীকৃতি না পেয়েও শুধু মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় টিকে আছে বগুড়া ইয়ুথ কয়্যার। পুরোনোদের হাত ধরে আসছে নতুন নতুন ছেলে-মেয়ে। এসব নবীন যেন তাঁদের সংগঠনের গানেরই চরণ, ‘ফুলবাগিচার ফুল হয়্যা হামরা ফুটিরে, সেই ফুলেরই বাসনায় বোগড়্যা মাত্যা রাখি রে।’

লেখক: প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক