২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির কথা। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মোজাম্মেল হকের মৃত্যু হয়। ভালোবাসা দিবসের ওই দিনে পৃথিবীব্যাপী মানুষ যখন পরস্পরকে ভালোবাসা জানাতে ব্যস্ত, মোজাম্মেলের স্ত্রী রুনা তখন ডানাভাঙা পাখি। স্বামীর মৃত্যুর মাসখানেক পরে স্থানীয় হকারদের পরামর্শে ব্যবসাটা শুরু করেন। সেই থেকে স্বল্প আয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে কিছুটা কষ্টেই দিন কাটছে রুনার। রুনা বলেন, ‘অন্য কোনো কাজ শিখি নাই। ব্যবসাটা হাতবদল করার সিদ্ধান্ত নিছিলাম। স্থানীয় কয়েকজন হকার সাহস জুগিয়েছেন। কারও কাছে হাত পাততে হয়নি। দিন চলে যাচ্ছে।’

রুনার স্বামী ১৫ বছরেরও বেশি সময় পত্রিকা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যবসায় লাভের টাকা দিয়ে চার কক্ষবিশিষ্ট একটি আধা পাকা বাড়িও করেছেন উপজেলা শহরে। প্রায় আট মাস কিডনি রোগে আক্রান্ত থাকায় জমানো টাকা চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে। রুনা জানান, ব্যবসাটা শুরুর সময় হিমশিম খাচ্ছিলেন। তবে হকাররা কেউ তাঁর টাকা বাকি রাখেন না। নিয়মিত টাকা পরিশোধ করেন। শুরুতে বড় ছেলে দোকানে আসত। মাসখানেকের মধ্যে সেও অনীহা প্রকাশ করে। অষ্টম শ্রেণি পাস করে বড় ছেলে কামরুল হাসান এখন ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করছে। ছোট ছেলে রিফাত হাসান পড়ছে তৃতীয় শ্রেণিতে।

পত্রিকা বিক্রি করে রুনার বর্তমানে মাসিক আয় ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা। বছর তিনেক আগেও এটা ছিল প্রায় ১০ হাজারের মতো। রুনা জানান, আগে ৩০০ কপি পত্রিকা বিক্রি হতো। বর্তমানে সব মিলিয়ে ২০০ কপি বিক্রি হয়। বড় ছেলে মাসে দুই হাজার টাকা সংসারে জোগান দিচ্ছে। রুনা বলেন, ‘ছোট ছেলের আবদার পূরণ করতে পারি না। জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়ায় হিমশিম খাচ্ছি। সংসারে অসুস্থ শাশুড়ি আছেন। তাঁকে দেখতে হয়। মাঝে মাঝে অর্থসংকটে পড়লে দেবর ও বাবার বাড়ি থেকে সহযোগিতা নিতে হয়। ছেলে দুটো মানুষ না হওয়া পর্যন্ত যত কষ্টই হোক করে যেতে হবে।’

উপজেলা শহরে কমবেশি সবাই চেনেন রুনার দোকান। উপজেলা চত্বরে সব অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছেও রুনা একটি পরিচিত মুখ। রুনা সম্পর্কে হাকিমপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ বলেন, ‘উপজেলা পরিষদের গেটের কাছেই রুনার দোকান। ওর সম্পর্কে জানি। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে রুনা আমার অফিসেও পত্রিকা দিয়ে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দোকানটি পরিচালনা করছেন। কষ্ট করছেন। ইতিমধ্যে বিধবা ভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। উপজেলা পরিষদ সব সময়ে তাঁর পাশে থাকবে।