বাংলাদেশের গণতন্ত্রেরই মতো সংকীর্ণ স্বার্থের কাছে সাংবাদিকদের উচ্চাশাভরা স্বপ্ন ধুলোর মর্ত্যে মুখ থুবড়ে পড়ে। সে আরেক দীর্ঘ কাহিনি।

লতিফুর রহমানের মুখোমুখি আমরা তাই বসে ছিলাম সংশয়িত মন নিয়ে। আমাদের জিজ্ঞাসার জবাব তিনি অল্প কথাতেই দিলেন। যা বললেন তার সারমর্ম হলো, পত্রিকাটিকে শক্ত পায়ের ওপর দাঁড় করাতে হলে একে অবশ্যই আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। প্রচারসংখ্যায় এটিকে নিয়ে যেতে শীর্ষতম স্থানে। আর সেটি করার একমাত্র পথ বস্তুনিষ্ঠ আর স্বাধীন সম্পাদকীয় অবস্থান। নির্ভীক সাংবাদিকতাই পত্রিকার আর্থিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান পথ।

এরপর লতিফুর রহমান যে কথাটি বললেন, সেটি এখনো কানে বাজে, ‘আপনারা এগিয়ে যেতে থাকলে আমি কেন, কখনো কারও কাছেই আপনাদের অবনত হতে হবে না। জিততে থাকা ঘোড়াকে কে বাধা দিতে পারে, বলুন?’

সেই শুরু। মতি ভাইয়ের সম্পাদকীয় নেতৃত্বে যাত্রা শুরু হলো প্রথম আলোর। তার পরের ঘটনা, যদি কম করেও বলা যায়, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসের একটি গর্ব করার মতো অধ্যায়।

গত ২৪ বছর ধরে আমরা যা কিছু করেছি, তার প্রধানতম ভিত্তি ছিল প্রথম আলোর সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে রক্ষা করা। বাংলাদেশের মতো বিচলিত গণতন্ত্রের এবং ক্ষমতার প্রতিহিংসাময় নিষ্পেষণের রাষ্ট্রে এই দায়িত্ব পালনের কাজটি ছিল এভারেস্ট পাড়ি দেওয়ার চেয়েও কঠিন।

এরপর লতিফুর রহমান যে কথাটি বললেন, সেটি এখনো কানে বাজে, ‘আপনারা এগিয়ে যেতে থাকলে আমি কেন, কখনো কারও কাছেই আপনাদের অবনত হতে হবে না। জিততে থাকা ঘোড়াকে কে বাধা দিতে পারে, বলুন?’

যত দোষ নন্দ ঘোষের মতো কেবল প্রতিহিংসাময় রাজনীতির দোহাই দিলেই সবটা চুকে যায় না। এ কথাও বলতে হয় যে স্বাধীন সম্পাদকীয় অবস্থান গড়ে তোলার পথে গণমাধ্যমের বিনিয়োগকারীরাই এর প্রথম বাধা। আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনীতিতে কালোটাকার পাহাড় গড়ে ওঠে ক্ষমতার সঙ্গে নিবিড় যোগসাজশে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সেই কালোটাকার মালিকেরাই মূলত গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করতে আসেন। সেসব গণমাধ্যমকে তাঁরা নিজেদের ব্যবসায়িক ও রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করেন। আঁতুড়ঘরেই গণমাধ্যমটির স্বাধীন সম্পাদকীয় অবস্থানের ভিত্তি ক্ষয়ে যায়।

সে কারণে প্রথম আলোকে প্রতিকূলতার যে বিপুল ঝড়ঝঞ্ঝা পার হয়ে আসতে হয়েছে, তার তালিকা করতে গেলে লতিফুর রহমানের নামটিই সবার আগে নিতে হবে। পত্রিকা প্রকাশের সময় তিনি মনস্থির করে নিয়েছিলেন, সরকারের সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্কে জড়াবেন না। সরকারের কয়েকটি পরামর্শক পরিষদের তিনি সদস্য ছিলেন। মনে পড়ছে, সরকারের চা-বিষয়ক একটি পরামর্শক পরিষদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের জন্য তাঁর একটি চিঠির খসড়া করে দিয়েছিলাম।

পূর্ণ গণতন্ত্রের মতো অবাধ ও মুক্ত সাংবাদিকতাও আকাশ থেকে পড়ে না। বিপুল প্রচেষ্টায় ক্রমশ তাকে অর্জন করতে হয়। সেই ধ্রুবতারার দিকে চোখ রেখেই আমরা এগিয়ে চলেছি।

তাই বলে আরও বাধা আসতে বাকি থাকেনি। রাজনীতি ও সমাজ—দুই বলয়েই লতিফুর রহমান আর মতিউর রহমানকে নিয়ে কুৎসা রটানো হয়েছে, পলকা অজুহাতে সম্পাদকের নামে মামলার পর মামলা হয়েছে, আইন ও প্রশাসনের সহায়তায় সাংবাদিকদের হেনস্তা করা হয়েছে, কোনো কোনো সাংবাদিকের জীবনের ওপর মৃত্যুর হুমকি এসেছে, একাধিক জায়গায় পত্রিকার বিতরণ রুদ্ধ করা হয়েছে, কেবল সরকারি নয়—বহু বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রথম আলোয় বিজ্ঞাপন দিতে বারণ করা হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এত সব বাধার মুখে সাংবাদিকতা করতে এবং টিকে থাকতে গিয়ে প্রথম আলোকে নিদারুণ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান থেকে ধার করে বলতে পারি, ‘মারের সাগর পাড়ি’ দিয়ে আমাদের এগোতে হয়েছে। কিন্তু আমরা যে এগিয়ে যেতে পেরেছি এবং পারছি, তার পেছনে আছে পবিত্র অগ্নিশিখার মতো স্বাধীন আর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করার সেই বাসনা ও প্রতিজ্ঞা। কারণ, সেটাই প্রথম আলোর পাঠকদের অকৃত্রিম ভালোবাসার উৎস এবং প্রতিষ্ঠানের দৃঢ় জনভিত্তি।

তাই বলে কি প্রথম আলো ভুল করে না? করে। কোনো ঘটনার পর্যালোচনায় প্রথম আলোর ত্রুটি ঘটে না? ঘটে। আমাদের সব সতর্কতা সত্ত্বেও সে রকম হতে পারে, হয়। বিশেষ করে আমাদের তীব্র সাংবাদিকতা-বৈরী পরিবেশে পদে পদে বিচ্যুতির শঙ্কা থেকে যায়। ভুল হলে আমরা তা স্বীকার করি, তা থেকে শিখি, সামনে এগিয়ে যাই। আমাদের বিশ্বাস, পাঠকেরা দেশের সামগ্রিক সংকুচিত পরিসরে আমাদের প্রয়াসের সে আন্তরিকতা বিলক্ষণ বুঝতে পারেন। সেটাই আমাদের শক্তি।

প্রশ্ন হলো, প্রথম আলো যে পথ কেটে চলেছে, সেটি কি শুধু প্রথম আলোর একারই চলার পথ? একেবারেই নয়। সাংবাদিকতাচর্চার মধ্য দিয়ে অর্জিত একজন সাংবাদিকের মুক্তির পরিসর অন্য আরেক সাংবাদিকেরও সাংবাদিকতাচর্চার ময়দান খুলে দেয়। তাই আরও দু-চারটি গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রথম আলো সাংবাদিকতাচর্চার মধ্য দিয়ে নিজের জন্য যে পরিসরটি রচনা করছে, সেটি সামগ্রিক অর্থে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেরই চর্চার পরিসর। আরেক অর্থে প্রথম আলো বাংলাদেশের সাংবাদিকতার পরিসরও রচনা করে চলেছে।

গণতন্ত্রের একটি প্রধান শর্ত রাষ্ট্রের পরিসরে নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের বাক ও কাজ, অর্থাৎ জীবনের চর্চা ও চর্যার স্বাধীনতা। এর একটি মাত্রা যদি হয় রাজনৈতিক কার্যক্রম, অবাধ নির্বাচন বা রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব ঘটানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; এর আরেকটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান তাহলে গণমাধ্যমেরও অবাধ চর্চা। বাংলাদেশে যেখানে নির্বাচন নানা প্রশ্ন ও শঙ্কার মুখে, রাজনীতিচর্চা প্রতিহত এবং সরকারে জনচেতনা অবহেলিত; সেখানে গুটিকয় গণমাধ্যমই টিমটিম করে জ্বলতে থাকা গণতন্ত্রের বিরল চিহ্ন। বিপুল অন্ধকারে প্রথম আলো সেই জ্বলন্ত সলতেটি সযত্নে রক্ষা করছে।

পূর্ণ গণতন্ত্রের মতো অবাধ ও মুক্ত সাংবাদিকতাও আকাশ থেকে পড়ে না। বিপুল প্রচেষ্টায় ক্রমশ তাকে অর্জন করতে হয়। সেই ধ্রুবতারার দিকে চোখ রেখেই আমরা এগিয়ে চলেছি।

ধানমন্ডি, ঢাকা
৩০ অক্টোবর ২০২২