জাতীয় পার্টির নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ ও পরিচয় নেই। আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি করে বা বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার কথা বলে। বামপন্থীরা বস্তুবাদী ও ইসলামপন্থীরা ধর্মভিত্তিক আধ্যাত্মিকতার রাজনীতি করে। কিন্তু জাতীয় পার্টি কোনো আদর্শিক ধারা বা পরিচয় সৃষ্টি করতে পারেনি।

বস্তুতপক্ষে জাতীয় পার্টি জগাখিচুড়ির রাজনীতি করেছে। ধর্মেও আছে, জিরাফেও আছে। জাতীয় পার্টিকে সব সময় বিএনপির বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কারণে জাতীয় পার্টির নিজস্ব কোনো অবস্থান তৈরি না হয়ে বিকল্পই থেকে গেল।

তাহলে জাতীয় পার্টি এত দিন কিসের রাজনীতি করল? নির্বাচনে আসনও পেয়েছে উল্লেখ করার মতোই। গঠনের সময় কিংস পার্টি হিসেবে রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছিল। কিন্তু সরকার থেকে বিদায়ের পর দলটির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল এরশাদের পরিচিতির কারণে না হারিয়ে গিয়ে অনেকটা আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়। এরশাদের মৃত্যুর পর দলটির ভবিষ্যৎ আবার সংকটের মুখে পড়েছে। কোন্দলের কারণে রওশন এরশাদ এবং জি এম কাদের দলটিকে বেশি দূর টেনে নিতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। দলটির জনভিত্তি তেমন নেই। ভবিষ্যতে দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে অবস্থা আরও করুণ হতে পারে। 

রাজনৈতিক দর্শনের জায়গায় বামপন্থীরা ঠিক জাতীয় পার্টির বিপরীতে অবস্থান করছে। শক্তিশালী ও পরিষ্কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবনা নিয়ে বাম ধারার দলগুলো রাজনীতি করছে। তাদের প্রতিটি বক্তব্যেই গণমানুষের মুক্তির কথা থাকে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে এই দলগুলো কখনোই গণমানুষের সংগঠনে পরিণত হতে পারেনি। বরং দিন দিন নাগরিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান
হিসেবে কাজ করছে। কর্মসূচি নিয়ে প্রতিনিয়তই তারা রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। কিন্তু এসব কর্মসূচিতে জনসমাগম
খুবই কম।

তাই নির্বাচনের মাঠ বা ক্ষমতার রাজনীতিতে বামপন্থীরা নিজেদের কখনোই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেনি। সামনের নির্বাচনে এই অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। নানা ধারায় বিভক্ত বামপন্থীরা আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সঙ্গে জোট বা সমঝোতা করে নির্বাচন করলে কিছু আসন পেতে পারে। অতীতে পেয়েছে। কিন্তু নিজেদের একক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কারণ হচ্ছে গণমানুষের মনস্তত্ত্বকে কখনোই তারা ধারণ করতে পারেনি। দেশের মানুষ কী চায়, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, দর্শন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনাকে আত্মস্থ করতে পারেনি। বরং আমদানি করা সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে দেশে প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে নিজেরাই রাজনীতির মাঠ থেকে উধাও হওয়ার পথে।

ইসলামপন্থীদের অবস্থাও বামপন্থীদের মতোই। তারাও নানা ধারায় বিভক্ত। বামপন্থীদের মতোই ধুঁকছে। দেশের অধিকাংশ মানুষের মনস্তত্ত্বকে ধারণ করতে পারেনি। ইসলামি আদর্শের কথা বললেও বিভিন্ন দর্শন, আদর্শ ও ফেরকায় দ্বিধাবিভক্ত ইসলামপন্থী দলগুলো। ফলে গণমানুষকে সম্পৃক্ত করতে না পারার কারণে রাজনীতির মাঠে তাদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়নি। বিভিন্ন ইস্যুতে বড় বড় জমায়েত করতে পারলেও রাজনীতির মাঠে এই জমায়েত খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে না।

ইসলামপন্থী দলগুলো গণমানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে কথা বলতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং বিভিন্ন সময় নিজেদের কট্টরপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করেছে। রাজনীতির মাঠে নিজেদের শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে হলে সাধারণ মানুষের মনোভাব বুঝতে হবে। সেই অনুযায়ী কথা বলতে হবে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, ইসলামপন্থীরা গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, গণমানুষের মুক্তি নিয়ে খুব বেশি কথা বলে না। গুম, খুন, দুঃশাসন নিয়ে নিয়ে তাদের পরিষ্কার কোনো বক্তব্য নেই। এ কারণে নির্বাচনী রাজনীতিতে এককভাবে ইসলামপন্থী দলগুলোর অবস্থান খুব বেশি জোরালো নয়। বিএনপি বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট গঠন করলেই কেবল কিছু আসন পেতে পারে।

ইসলামপন্থীরা নারীবিদ্বেষী ও বামপন্থীরা ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এটা হচ্ছে বিপরীত ঘরানার দুটি রাজনৈতিক শিবিরের সবচেয়ে বড় সংকট। এই সংকট থেকে তারা বের হতে পারেনি। ফলে এই দলগুলো দিন দিন বিএনপি–আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভর করে পরজীবী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। জাতীয় পার্টিও তাদের মতো পরজীবী হওয়ার পথে। একটা সময় পর্যন্ত তাদের নিজস্ব কিছু জনসমর্থন থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে এখন পুরোপুরিই বিএনপি–আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তাদের অবস্থা এতটাই খারাপ যে বিএনপি–আওয়ামী লীগের ভোট না পেলে তাদের পক্ষে এককভাবে জিতে আসা দুরূহ। জাতীয় পার্টি হয়তো দু–একটি আসন পেতে পারে। কিন্তু বামপন্থী ও ইসলামপন্থীদের সেই সম্ভাবনাও নেই। আর গণ অধিকার পরিষদ তরুণদের মধ্যে নিজস্ব পরিসরে সাড়া জাগাতে সক্ষম হলেও ভোটের মাঠে এককভাবে কতটা সফল হবে, এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ভোটের রাজনীতিতে সম্ভবত তাদেরও বাম, ইসলামপন্থী ও জাতীয় পার্টির মতোই বড় দুই দলের ওপর নির্ভর করতে হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক