দ্বিতীয়ত, গ্রীষ্মপ্রধান বাংলাদেশে ফল উৎপাদনের মৌসুম সীমিত হওয়ায় উৎপাদিত ফলের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। ফল প্রক্রিয়াজাত করার উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করে এ দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা ফল প্রক্রিয়াজাত করে দেশের চাহিদা পূরণ করবেন এবং বহির্বিশ্বে রপ্তানি করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে বিশ্বে ২৮তম স্থানে থাকলেও কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে। কাজেই ফলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা রয়েছে, শুধু প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা।

অপর দিকে বাংলাদেশে ৩ দশমিক ৭৪ লাখ হেক্টর জমিতে ৩১ দশমিক ৩০ লাখ টন সবজি উৎপাদিত হয়ে থাকে, যা চাহিদার তুলনায় কম। প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের দৈনিক ২৫০ গ্রাম সবজি খাওয়া প্রয়োজন। আমরা প্রতিদিন খাচ্ছি মাত্র ১৬৬-১৭০ গ্রাম। চাহিদা অনুযায়ী আমাদের কম করে হলেও ১১২ লাখ টন সবজি উৎপাদন করা বাঞ্ছনীয়। সবজি উৎপাদনে আশার বিষয় হচ্ছে, সবজি আবাদি জমির হার বৃদ্ধিতে বিশ্বে বাংলাদেশ প্রথম এবং সবজি উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে তৃতীয়। তাই বর্তমান সবজি উৎপাদনের ঘাটতি কমানোর সক্ষমতা বাংলাদেশের কৃষকের রয়েছে। শুধু তাঁদের সঠিক সময়ে উন্নত জাতের বীজ (হাইব্রিড), সার ও কীটনাশক সরবরাহ করা দরকার। ফল ও সবজি উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে কৃষি মন্ত্রণালয় সবজি ও ফল উৎপাদনে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে।

বলা দরকার, এ দেশে প্রায় ৭০ প্রকার ফল ও ৯০ প্রকার সবজি উৎপাদিত হয়ে থাকে। তাই প্রকল্পে শুধু হাই ভ্যালু সবজি ও ফলের প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। যেমন সবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন, আলু, করলা, ঢ্যাঁড়স, শসা, মাশরুম, গাজর, মিষ্টি মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, চীনা বাঁধাকপি, মুলা, পালংশাক ও লেটুস। অপর দিকে ফলের মধ্য আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, পেয়ারা, কুল, তরমুজ ও আমড়া। সবজি ও ফলের মধ্য শুধু হাই ভ্যালু সবজি ও ফল উৎপাদন ও গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ সবজিগুলো হচ্ছে মিষ্টিকুমড়া, শিম, ঢ্যাঁড়স, শসা, টমেটো, করলা, পাতাজাতীয় সবজি লালশাক, পালংশাক, কচুশাক ইত্যাদি।

আর পুষ্টির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফলগুলো হচ্ছে কাঁঠাল, আম, কলা, পেঁপে, আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, পেয়ারা, কুল, তরমুজ ও আমড়া। কারণ হলো ভিটামিন সি–এর অভাবে স্কার্ভি, ডি–এর অভাবে রিকেট, ভিটামিন ই–এর অভাবে নিউরোলজিক্যাল রোগ, কে–এর অভাবে রক্তক্ষরণ এবং ভিটামিন এ–এর অভাবে রাতকানা রোগ হয়ে থাকে। তাই সুস্থ–সবল ও রোগব্যাধি থেকে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের এবং শিশুদের নিয়মিত ফল ও সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

প্রবাদ আছে, প্রতিদিন একটি পেঁপে খেলে জীবনে ডাক্তারের প্রয়োজন হয় না। ফলই বল। তাই ফল না খেলে বল বা শক্তি হবে না। অতএব জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি রোগীর পথ্য হিসেবে অথবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফল ও সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে আমাদের সবার বিশেষ করে শিশুদের ফল ও সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাহলে আমরা পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে সুস্থ ও মেধাবী জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারব।

ড. এম মোফাজ্জল হোসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের সাবেক ডিন