এদিকে ১০ মিনিটের কম সময়ের মধ্যে পৌঁছে প্রণবদার ফোন, ‘একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স ঢুকছে, হতাহত গোনার সময় পাচ্ছেন না মেডিকেলের কর্মীরা।’ প্রণবদা ফোনে কথা বলার সময়ও ওপাশে শোনা যাচ্ছিল মানুষের চিৎকার, আর্তনাদ। বোঝাই যাচ্ছিল পরিবেশটা কেমন। কারও সঙ্গে কথা বলার অবস্থা নেই হাসপাতালের কর্মী-চিকিৎসক কারও। সময় যতই যাচ্ছে আমারও টেনশন বাড়ছে। চট্টগ্রাম সংস্করণে কতটুকু দিতে পারব, সর্বশেষটা দিতে পারব তো? তাগাদা দিয়ে যাচ্ছিলাম প্রণবদাকে। এর মধ্যে ছবির অবস্থা জানতে সৌরভকে ফোনে পাচ্ছিলাম না। পরে জানলাম ভিড়ের মধ্যে চুরি হয়ে গেছে সৌরভের ফোন।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজীব ভাইয়ের আবার তাড়া। কতটুকু? এটা সেকেন্ড লিড। বললাম, এই তো গুছিয়ে এসেছি। কিন্তু আসলে তখনো নিশ্চিত হতে পারছিলাম না কতজন মৃত। ‘সাদাচোখে’ দেখা আর কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে আটকা নিউজ। সময়ের সঙ্গে যেন প্রাণপণ লড়াই। শেষমেশ প্রণবদা ও কৃষ্ণের সঙ্গে কথা বলে দুজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে চট্টগ্রাম সংস্করণের জন্য নিউজ ছাড়লাম আমরা। রাতে ঢাকা সংস্করণে আরও দুজন বেড়ে তা চারজন পর্যন্ত দিলাম। সেদিন চট্টগ্রাম সংস্করণে প্রথম আলো ছাড়া ঢাকার অন্য কোনো পত্রিকা নিউজটি ধরাতে পারেনি।

প্রিন্টের পাশাপাশি সমানতালে চলছিল অনলাইনে নিউজে দেওয়া। কৃষ্ণ ঘটনাস্থল থেকে কিছুক্ষণ পরপর আপডেট দিচ্ছিল। হাসপাতাল থেকে প্রণবদা। এভাবে সকাল পর্যন্ত চলল আমাদের যুদ্ধ। রাত জেগে ঘটনাস্থল আর হাসপাতালে সমন্বয় করে যাচ্ছিলাম। হাসপাতালে প্রণব-সৌরভ, ঘটনাস্থলে কৃষ্ণ। এর মধ্যে চলল পরের দিনের পরিকল্পনা।

এবার সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়া। সকাল সকাল ঘটনাস্থলে চলে গেলেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক গাজী ফিরোজ ও আলোকচিত্রী জুয়েল শীল। সেখানে কৃষ্ণের সঙ্গে মিরসরাই থেকে যুক্ত হলেন ইকবাল হোসেন। এ ছাড়া আনোয়ার মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন ও রাউজানের এস এম ইউসুফ উদ্দিন যুক্ত হলে নানা আঙ্গিকে। হাসপাতালে যোগ দিলেন প্রতিবেদক সুজয় চৌধুরী, বন্দর ও আমদানি-রপ্তানিবিষয়ক খোঁজে নামলেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মাসুদ মিলাদ।

নির্ঘুম রাত কাটার পর দুই ঘণ্টারও কম সময় ঘুম হল। আবার লেগে পড়লাম। সকালে রাজীব ভাই, টিপু ভাই ও তুহিন ভাইয়ের (তুহিন সাইফুল্লাহ, বিশাল বাংলার প্রধান) সঙ্গে কথা বলে কাজের পরিকল্পনা ঠিক হলো। ১২ মিটিংয়ে বিস্তারিত জানিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে আমিও বেরিয়ে পড়লাম। সেখানে স্বজনহারাদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে আসে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে চলি আসি অফিসে। এরপর জ্যেষ্ঠ সহ সম্পাদক আহমেদ মুনিরকে পাঠালাম ঘটনাস্থলে। তিনিও অনলাইনে খবর দিলেন। নানা দিক থেকে অনলাইনে নিউজ উঠছে। ঘটনার পর থেকে দুই দিনে অনলাইনে নিউজ উঠেছে শতাধিক।

প্রিন্টের জন্য আলাদা পরিকল্পনা দরকার। সব তো অনলাইন-ফেসবুকে জেনে যাচ্ছে। টিপু ভাই গাউড করলেন। দিকনির্দেশনা দিলেন কীভাবে প্রিন্টের স্টোরি তৈরি করব।

সেই দায়িত্ব দেওয়া হলো মাসুদ মিলাদকে। লিডের পাশপাশি মূল ও সংস্করণের পাতার জন্য বেশ কয়েকটি স্টোরি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিলাম। আটটার দিকে ঢাকা অফিস থেকে অপারেটরের ফোন, ‘সম্পাদক স্যার কথা বলবেন।’ মতি ভাই (মতিউর রহমান, শ্রদ্ধেয় সম্পাদক) বললেন, ‘আশরাফ ভালো করেছ। রাত জেগে কাজ করার জন্য ধন্যবাদ।’ মতি ভাইয়ের এই ফোন কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ। শুধু তা–ই নয়, চট্টগ্রাম অফিস কাজের পুরস্কারস্বরূপ পেয়েছে ৫০ হাজার টাকা। এটাই প্রথম আলো। কাজের মূল্যায়ন হয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। জয়তু প্রথম আলো।

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, চট্টগ্রাম অফিস