গৌরবোজ্জ্বল পথচলা 

২০২১ সালে হীরকজয়ন্তী উদ্যাপন করেছে বাকৃবি। ৬০ বছরের এই গৌরবোজ্জ্বল পথচলায় এসেছে বহু সাফল্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব গবেষণা তদারক করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস)। বাউরেসের পরিচালক অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন জানান, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৯৩৭টি গবেষণা প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে, চলমান আরও ৫৮০টি কার্যক্রম। এ ছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যৌথ গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। 

সম্প্রতি মাছ থেকে বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়াজাত পণ্য উদ্ভাবন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। এর মধ্যে মাছের চানাচুর, তিলের খাজা ও আচার, ফিশ পিনাট বার, ফিশ বার্গার, ফিশ চিপস, ফিশ কাটলেট ও ফিশ পাস্তা অন্যতম। কয়েক মাস আগে শর্ষের উচ্চফলনশীল ৫টি জাতসহ লবণসহিষ্ণু ৩টি জাত, মিষ্টি আলুর নতুন ৩টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। বোরো মৌসুমের জনপ্রিয় ধানের জাত ব্রি-২৮ পাতা ঝলসে যাওয়া (ব্লাস্ট) রোগে আক্রান্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্লাস্টপ্রতিরোধী বাউ-ধান-৩ নামে একটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। 

বিশ্বে মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ হয় বাংলাদেশে। ইলিশ নিয়ে অধিকতর গবেষণা ও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ইলিশের জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। এখানে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ জাতের ছাগলের জীবনরহস্যও উন্মোচন করা হয়েছে। 

ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কারণে মাংসে ভারী ধাতু ও ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ‘প্লানটেইন’ নামক একধরনের ঘাসে অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প খুঁজে পেয়েছেন বাকৃবির গবেষকেরা। এ প্রক্রিয়ায় গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ ও অধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ মুরগির মাংস উৎপাদনের প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাউ-প্লানটিভ’। 

গবাদিপশুর একধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ ব্রুসেলোসিস। প্রাণী ও মানবদেহে ছোঁয়াচে রোগগুলোর মধ্যে সংক্রমণের দিক থেকে যক্ষ্মা ও অ্যানথ্রাক্সের পরই ব্রুসেলোসিসের অবস্থান। এ রোগ নির্ণয় করা গেলেও দেশে কোন জীবাণু দায়ী, তা শনাক্ত করা যায়নি। ব্রুসেলোসিস রোগের জীবাণু শনাক্তকরণ ও এই ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স এখানে সম্পন্ন হয়েছে। 

এ ছাড়া বাউকুল, ধান, শর্ষে, সয়াবিন, আলু, মুখিকচুর বেশ কয়েকটি করে জাত উদ্ভাবন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ধান শুকাতে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বাকৃবির ‘বাউ-এসটিআর’ দিয়ে কম সময়ে ধান শুকানো সম্ভব। এ ছাড়া সার ও বীজ ছিটানো যন্ত্র, পাম অয়েল মেশিন, আগাছা দমনের যন্ত্রও উদ্ভাবন করা হয়েছে। 

তারাবাইম, গুচিবাইম, বড় বাইম, কুঁচিয়া, গাঙমাগুর, কই ও বাটা মাছের কৃত্রিম প্রজননপদ্ধতিও আবিষ্কার করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষপ্রযুক্তি, কচি গমের পাউডার, বিদ্যুৎবিহীন হিমাগার। কলা ও আনারস উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তি, জৈব সার উৎপাদনের প্রযুক্তি, মাটি পরীক্ষার সরঞ্জাম, গবাদিপশুর ভ্রূণ প্রতিস্থাপন, গাভির ওলান প্রদাহ রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি, মাছের রোগ প্রতিরোধকল্পে ঔষধি গাছের ব্যবহারের প্রযুক্তি। 

দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেয় এখানকার গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (জিটিআই)। ১১ হাজার ফল ও মসলার প্রজাতি নিয়ে এখনকার ‘জার্মপ্লাজম সেন্টার’ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগ্রহশালা। এ সেন্টার থেকে শতাধিক নতুন ফলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। সমৃদ্ধ ও সুবিশাল এক বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়েছে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় দেশি-বিদেশি উদ্ভিদের ছয় শতাধিক প্রজাতি। পাশাপাশি উপকূলীয়, ঔষধি, জলজ, মরুজ, ফলদ উদ্ভিদসহ বিভিন্ন দুর্লভ প্রজাতির উদ্ভিদও সংরক্ষণ করা আছে। 

বাকৃবির ক্যাম্পাসে অবস্থিত কৃষি জাদুঘরের ছয়টি কক্ষে সাজানো আছে আমাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ জীবনের নানা অনুষঙ্গ। আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে এখানে খুঁজে পাবেন দর্শনার্থীরা। 

লেখক: কৃষিবিদ