প্রথম আলো ট্রাস্ট মূলত সমাজের পিছিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ট্রাস্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী ২০০৯ সালের ২৩ মে প্রথম আলো ট্রাস্ট গঠিত হওয়ায় মাধ্যমে প্রথম আলোর সব সামাজিক কাজ আরও সংহত রূপ পায়। গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৩৩ জন অদম্য মেধাবী শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ হয়েছেন চিকিৎসক, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ শিক্ষক, কেউ কাজ করছেন প্রশাসনের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে। অদ্বিতীয়াদের মধ্যে কেউ দেশের বাইরে পিএইচডি করছেন, কেউ ম্যাকগ্রিল ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করছেন, অনেকেই কাজ করছেন জাতিসংঘের নানা প্রতিষ্ঠানে। বন্যায় পানিবন্দী মানুষের কাছে খাদ্যসহায়তা কিংবা শীতার্ত মানুষের কাছে শীতবস্ত্রের উষ্ণতা পৌঁছে দিতে প্রথম আলো ট্রাস্ট ত্রাণ তহবিল সব সময় ছুটে গেছে দুর্গত মানুষের কাছে। ২০০৭ সালের সিডরের ত্রাণকাজের ৩ কোটি ৮ লাখ ৪২ হাজার ৫১২ টাকা, ২০০৯ সালে আইলার সময় ৪৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৯৪ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য ব্যয় করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের ভয়াবহ বন্যায় সিলেটের ৭টি, সুনামগঞ্জের ৪টি, নেত্রকোনার ৪টি উপজেলা ও কুড়িগ্রামের ৫টি ইউনিয়নের দুর্গত মোট ৩ হাজার ৬৪৩টি পরিবারের মধ্যে ২৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। ২০২২ সালেও ৪ হাজার ১০০ পরিবারের কাছে শীতবস্ত্র পৌঁছে দিয়েছে প্রথম আলো ট্রাস্ট।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি, এ রকম অবহেলিত এলাকায় শিক্ষার আলো পৌঁছে দিচ্ছে প্রথম আলো ট্রাস্ট। সামিট গ্রুপের সহযোগিতায় প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় এসব দুর্গম এলাকায় ছয়টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গঙ্গাধর, দুধকুমার আর ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় দুই যুগ আগে জেগে ওঠে নামহীন এক চর। ২০০৫ সালে এলাকাবাসীর ভালোবাসা–কৃতজ্ঞতায় নামহীন এই জনপদের নাম হয় ‘প্রথম আলো চর’। ১৬ থেকে শুরু হয়ে এখন ৪৫০ পরিবারের বাস প্রথম আলো চরে। ২০০৯ সালে চরের শিশুদের জন্য যাত্রা শুরু করে ‘প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালা’। রাজশাহীতে দুটি, ভোলায় একটি, নওগাঁয় একটি, টেকনাফে একটি ও কুড়িগ্রামের প্রথম আলো চরে একটি স্কুল পরিচালনা করছে প্রথম আলো ট্রাস্ট। ৬টি স্কুলে মোট ১ হাজার ৩০০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

স্মরণকালের ভয়াবহ রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য ‘মেরিল-প্রথম আলো সাভার সহায়তা তহবিল’ গঠন করা হয়। ঘটনার পর থেকেই এর কার্যক্রম শুরু হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আহত ব্যক্তিদের জন্য খাবার ও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। মোট ৫৪ লাখ টাকা নিয়ে মেরিল-প্রথম আলো সাভার সহায়তা তহবিল যাত্রা শুরু করে। সমাজের সব স্তরের মানুষ এই তহবিলে অর্থ দেন। সাভার সহায়তা তহবিলে বিভিন্ন সময়ে মোট জমা হয় প্রায় ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এই তহবিল থেকে উদ্ধারকাজ ও চিকিৎসায় প্রায় ৭১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ১০১ ব্যক্তিকে পুনর্বাসনের সহায়তায় ব্যয় করা হয় ১ কোটি ৫০ হাজার টাকা। বাকি অর্থ থেকে ৫০ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত করা হয়। এই আমানতের লভ্যাংশ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত (আহত-নিহত) পরিবারের ২০ সন্তানকে শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে প্রথম আলো ট্রাস্ট। ইতিমধ্যে একজন স্নাতক ও একজন ডিপ্লোমা শেষ করেছেন, অন্যরা বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। স্নাতকোত্তর পর্যন্ত এ সহায়তা দেওয়া হবে।

দেশ থেকে মাদকের অভিশাপ দূর করার মতো কাজে প্রথম আলো ট্রাস্ট নিয়োজিত সেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। প্রতি মাসে ধানমন্ডির ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভায় বিশেষজ্ঞরা মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন বার্তা ও মানসিক নানা সমস্যার সমাধান করার পরামর্শ প্রদান করে আসছেন। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ পরামর্শ সহায়তা সভার আয়োজন করা হচ্ছে।

দেশ থেকে অ্যাসিড-সন্ত্রাস কমে আসার পেছনেও আছে প্রথম আলো ট্রাস্টের ভূমিকা। ‘আর একটি মুখও যেন অ্যাসিডে ঝলসে না যায়’ অঙ্গীকার নিয়ে প্রথম অ্যাসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন, ফিচার ও সম্পাদকীয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। অ্যাসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি ও জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের সহায়তা দিয়েছে ‘অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল’। প্রথম আলো পরিবারের সদস্যদের এক দিনের বেতন দিয়ে এই তহবিলের যাত্রা শুরু হলেও তহবিলটি চলে প্রথম আলোর পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের আর্থিক সহযোগিতায়। অ্যাসিড তহবিলের মাধ্যমে ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪৫৬ জন অ্যাসিডদগ্ধ নারীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অ্যাসিড-সন্ত্রাসবিরোধী প্রচারণায় সুফল মিলেছে। ২০০২ সালে যেখানে বছরে ৫০০-এর মতো নারী অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হন, সেখানে ২০২১ সালে নেমে এসেছে ১৯ জনে। আমাদের লক্ষ্য এ ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।

এ ছাড়া নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার দড়ি হাইরমারা গ্রামে ২০১৫ সালে প্রথম আলো ট্রাস্ট-সাদত স্মৃতি পল্লী প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। নিয়মিতভাবে গ্রামের অসহায়–দরিদ্র মানুষের জন্য সপ্তাহে তিন দিন তিনজন চিকিৎসক দ্বারা বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। মোট ৬০ বয়স্ক ব্যক্তিকে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। ওই অঞ্চলের শিশু-কিশোর ও যুবকদের পাঠের অভ্যাস এবং জ্ঞানচর্চার জন্য লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়েছে।

‘আরজান-আরিশ’ শিশুপার্কে গ্রামের শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থা, তাদের মানসিক বিকাশের জন্য গল্পের বই পড়ার অভ্যাস, ছবি আঁকা, কম্পিউটার ও নৈতিক শিক্ষাবিষয়ক ক্লাস নেওয়া হয়। এ ছাড়া চক্ষুশিবির করে চোখের ছানি অপারেশন, শীতবস্ত্র বিতরণ, কিশোরীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণসহ নানা কার্যক্রম চালু আছে এ প্রকল্পে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট ১১ জন ট্রাস্টির সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। তাঁরা হলেন বার্জার বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রূপালী চৌধুরী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার তানজিব-উল-আলম, এনভয় গ্রুপের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ, সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান, সানিডেইল স্কুলের অধ্যক্ষ তাজিন আহমেদ, সেন্ট্রাল উইমেন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. পারভীন হাসান, এম এম ইস্পাহানি লিমিটেডের পরিচালক জাহিদা ইস্পাহানি, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম ও আনিসুল হক।

প্রথম আলো ট্রাস্ট সব সময় মানুষের জন্য। আলো হাতে মানুষের পাশে প্রথম আলো ট্রাস্ট সাধারণ মানুষের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে। প্রথম আলো ট্রাস্ট চায় দেশের মানুষের মুখের অমলিন হাসিটা ধরে রাখতে।

লেখক: সমন্বয়ক, প্রথম আলো ট্রাস্ট