শুধু প্রসূতিসেবায় নিজেকে ব্যস্ত রাখেননি সিস্টার রোজ। প্রায় ১৭ বছর হলো হাসপাতালে ‘জি ওয়ার্ড’ নামে একটি বৃদ্ধাশ্রমও চালু করেছেন। বর্তমানে সেখানে আছেন ১৮ জন। একটা নার্সিং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটও প্রতিষ্ঠা করেছেন রোজ। স্থানীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার, ১৬ জন শিক্ষা নিচ্ছেন।

গত সোমবার সকালে বল্লভপুর মিশন হাসপাতালের লোহার দরজা পার হতেই শিশুদের কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। একটু সামনে যেতেই দেখা গেল কাঠের সারিবদ্ধ বেঞ্চে অপেক্ষমাণ অর্ধশতাধিক রোগী ও তাঁদের স্বজন। পশ্চিম পাশে ইটবাঁধানো সড়কের দুই পাশে নানা বাহারি ফুলের সারি সারি গাছ। ভেতরে ইটবাঁধানো লনে প্রসূতিরা হেঁটে বেড়াচ্ছেন। মাঝেমধ্যে চেয়ার পাতা। অনেকে সেখানে বসে একে অপরের সঙ্গে গল্প করছেন। এসবের মধ্যেই নীরবে নিভৃতে চিকিৎসা দিয়ে চলেছেন সিস্টার রোজ। 

সদর উপজেলার দফরপুর গ্রামের কৃষক হাফেজদ্দি সরকার তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে এসেছেন। বলেন, ‘এই হাসপাতালেই আমার ছেলে জন্ম নিয়েছে। এখানকার চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর ভরসা এই হাসপাতাল। আমার ছেলে নাইম হোসেনের আজ ১১ দিন ধরে জ্বর। দেখানোর জন্য সিস্টার রোজের কাছে এসেছি। তিনি দেখে ওষুধ দিলেই সেরে উঠবে আমার ছেলে।’

সিস্টার রোজের কক্ষে তখন অনেক রোগী। দেখা করতে চাইলে হাসপাতালের একজন বললেন, এভাবে সরাসরি তো সাক্ষাৎ করতে পারবেন না। আগে তাঁকে জানাতে হবে। রোগী ছাড়া আর কারও সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করতে চান না। একপর্যায়ে সামান্য সময়ের জন্য কথা বলার অনুমতি মিলল। এ সময় সিস্টার রোজ বলেন, ‘খুব সামান্য সেবাই দিতে পেরেছি। এসব আমি জানাতে চাই না। মনের শান্তি থেকে এসব করি। তবে পাসপোর্ট নবায়ন করতে খুব বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার নাগরিকত্বের আবেদন করেছে কয়েকবার।’ 

১৯৩৯ সালে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা সি এ রোজের ঘরে জন্ম নেন জিলিয়ান রোজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাবাকে হারান জিলিয়ান। মা ও একমাত্র ভাইকে নিয়ে চলছিল তাঁদের সংসার। এ সময় হঠাৎ খ্রিষ্টধর্ম প্রচারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই আগ্রহই তাঁকে ইংল্যান্ডের বাইরে ধর্মপ্রচারে উৎসাহিত করে। চলে আসেন বাংলায়।

তারপর গ্রামবাংলার মানুষকে ভালোবেসে তিন দশক ধরে সেবা দিয়ে চলেছেন জিলিয়ান রোজ। বাংলার প্রেমে পড়ে শাড়ি পরেন, প্রাত্যহিক খাবারও তাঁর মাছ–ভাত। এই ব্রিটিশ নারীর অন্তিম ইচ্ছে হাসপাতালের আশপাশেই যেন হয় তাঁর শেষ ঠিকানা।

লেখক: প্রথম আলোর মেহেরপুর প্রতিনিধি