ফলে কিশোর বয়সেই রিটন দে বাবাকে সাহায্য করতে চট্টগ্রামে এক বাসচালকের সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এই কাজে পেরিয়ে যায় প্রায় সাত বছর। দুর্ঘটনা ঘটল ১৯৯৪ সালে। সেদিনও রোজকার মতোই বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা-নামানোর কাজ করছিলেন রিটন। এমন সময় পাশ থেকে আরেকটি বাসের ধাক্কা লাগে তাঁর বাঁ হাতে। হাতটি গুরুতর জখম হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাতটি আর ভালো হলো না। বাহু পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়।

জীবনে হঠাৎ দুর্যোগ নেমে এলেও হেরে যাননি রিটন দে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে শুরু করেন পত্রিকা বিক্রির কাজ। পটিয়া থানার সামনে বসে কাগজ বিক্রি করতেন আবুল কাশেম। তিনিই সহায়তা করেন রিটনকে। প্রথমে বছরখানেক আবুল কাশেমের কাছ থেকে কাগজ নিয়ে হেঁটে হেঁটে পাড়ায় পাড়ায় বিক্রি করেছেন। পরে এক হাতেই বাইসাইকেল চালাতে শিখে নেন রিটন দে। এরপর থেকে রোজ সকাল আটটায় সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পটিয়া শহরে আসেন পত্রিকা নিতে।

প্রবীণ হকার আবুল কাশেম মারা গেছেন। তাঁর জায়গায় এসেছেন নূরুল আলম। রিটন এখন তাঁর কাছ থেকে কাগজ নিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ধরে এক হাতে সাইকেল চালিয়ে পটিয়ার ইন্দ্রপুল, বিসিক শিল্পনগরী, আমির ভান্ডার রেলগেট পটিয়া পৌর সদরের বিভিন্ন অফিস, আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে গিয়ে পত্রিকা পৌঁছে দেন দুপুর পর্যন্ত। কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে বিকেল।

রিটন দে জানান, বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও বৈচিত্র্যময় সংবাদের কারণে প্রথম আলো মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দৈনিক মিলিয়ে রোজ প্রায় ৫০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতেন। তাতে প্রতিদিন তার ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু করোনার পরে কাগজ বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে। এখন প্রায় দেড় শ কপি বিক্রি হয়, কমিশন থাকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মতো। এই আয়ে সংসার চালানো বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে।

রিটন দের বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। তিনি ২০০১ সালে পটিয়ার সূচক্রদণ্ডী গ্রামের করবী দেকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। তাঁদের দুই ছেলে। বড় ছেলে রূপায়ণ দে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে এবং ছোট ছেলে বাদন দে নবম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ভাইসহ রিটন ২০১৪ সাল পর্যন্ত যৌথ পরিবারে ছিলেন। তখন পৈতৃক ৫ গন্ডা ভিটাতে দুই ভাই মিলে পাকা ঘর করেছেন। এ ছাড়া তাঁর আর কোনো সম্বল নেই বলে জানান।

রিটন জানান, আয় কমে গেলেও পত্রিকা বিক্রি করা ছাড়া অন্য কিছু করার উপায় তাঁর নেই। তবে এই কাজ করতে গিয়ে সবার কাছে তিনি অনেক সহায়তা পেয়েছেন। তাঁকে ভালোবেসে অনেকেই পত্রিকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি কিছু টাকাও দেন। প্রায় ২৮ বছর ধরে এভাবেই কাটছে তাঁর জীবনসংসার।