মলার কৃত্রিম প্রজননের ভাবনাটা তাঁর মাথায় প্রথম ঢোকান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক আবদুল ওয়াহাব। ২০০৩ সালে থাই কই মাছের চাষ করার পর আবদুল ওয়াহাবের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তারপর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ। তখন থেকেই আবদুল ওয়াহাব তাঁকে মলা মাছের কৃত্রিম প্রজনন করার তাগিদ দিতেন। অন্য যেকোনো মাছের চেয়ে পুষ্টিগুণে এগিয়ে মলা। এ মাছকে বলা হয় প্রাকৃতিক পুষ্টির আধার। বিভিন্ন রোগ থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেয় এ মাছ। একে সুপার ফিশ অভিহিত করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন আবদুল ওয়াহাব বলেন, ‘১৫ কি ১৬ বছর আগেই নুরুল হককে বলেছিলাম মলার প্রজনন নিয়ে কাজ করো।’ শুরুর দিকে তিনি হয়তো বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। ২০১৬ সালে মলার কৃত্রিম প্রজনন নিয়ে কাজ শুরু করেন নুরুল হক।

কাজটা সহজ ছিল না। সাফল্য আসতে বছর তিনেক লেগে যায়। নিজের পুকুরে কিছু ডিমওয়ালা মলা দিয়ে শুরু হয় কাজ। ওই ডিমওয়ালা মাছগুলোতে বিভিন্ন মাত্রায় হরমোন প্রয়োগ করেন। কত মাত্রায় হরমোন প্রয়োগ করলে মলা মাছ ডিম দিতে পারে, সেটি নির্ধারণ করেন। এটুকু কাজ করতেই অনেক দিন চলে যায়। ২০১৯ সালের এপ্রিলে নিজের হ্যাচারিতে মলা মাছের কৃত্রিম প্রজনন শুরু করেন।

নুরুল হক জানান, মলা মাছ যেমন পুষ্টিকর, তেমনি চাষও লাভজনক। একবার কোনো পুকুরে মলার রেণু ছাড়া হলে পরে আর রেণু ছাড়তে হয় না। তাঁর কল্যাণে এখন দেশের উত্তর থেকে শুরু করে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত চাষ হচ্ছে এ মাছ। ২০২০ সালে মলা চাষের সঙ্গে যুক্ত হন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাহবুব হাসান। তিনি বলেন, ‘ওই বছর নুরুল হকের পরামর্শে পাঁচ হাজার টাকার মলা মাছের রেণু কিনি। চার মাসের মাথায় ওই মাছ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করি। শুরুতেই লাভবান হওয়ায় মাছ চাষে আরও বেশি আগ্রহী হই।’ মাহবুব হাসানের মতো অনেকেই এখন মলা মাছের চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।

মলা মাছের কৃত্রিম প্রজনন কৌশল বের করার স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছরের ২১ জুলাই নুরুল হক পেয়েছেন জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণপদক)। সফল মাছচাষি হিসেবে এর আগে ২০১২ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকও পেয়েছেন নুরুল হক। ২০০৯ সালে তিনি মৎস্য অধিদপ্তরের স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি জাতীয় যুব পুরস্কার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বাউরেস) প্রদত্ত কৃষি পুরস্কার, চ্যানেল আই কৃষি পদকসহ বিভিন্ন পদকে ভূষিত হয়েছেন।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর পুলিয়ামারি গ্রামে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের পাশে নুরুল হকের ‘ব্রহ্মপুত্র ফিশ সিড’। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই হ্যাচারিতেই থাকেন। কর্মীদের নিয়ে পার করেন ব্যস্ত সময়। ইন্টার্নি করতে দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নুরুল হকের হ্যাচারিতে আসেন।

নুরুল হক বলেন, ‘১৯৮৮ সালে শখের বশে মাছ চাষ শুরু করেছিলাম। এটিকেই এরপর জীবনের ধ্যানজ্ঞান করে নিয়েছি। শুরুতে এটি আমার কাছে শুধু ব্যবসাই ছিল। এখন আর এটি শুধু ব্যবসা নয়। দেশের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করার তাড়না সব সময়ই অনুভব করি।’

লেখক:প্রথম আলোর ময়মনসিংহ প্রতিনিধি