শেষ পর্যন্ত সরকার গ্যাস আমদানির পথে যায়। নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর প্রসঙ্গ উঠলে নীতিনির্ধারকদের যুক্তি ছিল, নতুন করে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান করে উৎপাদনে যেতে ছয়-সাত বছর লেগে যাবে। কিন্তু সে সময় যতগুলো গ্যাসক্ষেত্র চালু ছিল, সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব ছিল। আমাদের গ্যাসের মজুতের বেশির ভাগটাই পেট্রোবাংলার হাতে। আইওসিরা তাদের গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়াতে পারলেও পেট্রোবাংলা তা তেমন পারেনি। এটা চরম ব্যর্থতা। গ্যাসের নিজস্ব উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে মনোযোগটা আমদানির ওপর কেন্দ্রীভূত করাটা অনেক বড় ভুল। যদিও আমাদের আমদানিরও দরকার আছে।

২০১৮ সালে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। এটা সঠিক সিদ্ধান্ত। অবশ্যই এলএনজি আমদানির পথটা খোলা রাখতে হবে। কেননা, আমাদের গ্যাসের যে মজুত, তাতে ঘাটতিটা ধীরে ধীরে বাড়বেই। তবে এলএনজি কেনাকাটায় আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। গ্যাসের ঘাটতিটা স্বল্পমেয়াদি নয়, সেটি মৌলিক ঘাটতি এবং স্থায়ী। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিবর্তে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার সিদ্ধান্তটা ভুল। আবার বর্তমান ও ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য করে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালও আমরা নির্মাণ করিনি।

সংকট উত্তরণে স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি ব্যাপকভাবে করতে হবে। সমুদ্রের ক্ষেত্রে আগে জরিপ করা প্রয়োজন। যদিও সরকার বলছে, জরিপ ও বিডিং একসঙ্গে করবে, যারা বিডিংয়ে পাবে, তারাই জরিপ, অনুসন্ধান ও উত্তোলন করবে। জরিপ না করে গেলে চুক্তিতে আমরা আমাদের পক্ষে সুবিধাটা আদায় করতে পারব না। বিদেশি কোম্পানিগুলোর শর্তে আমাদের রাজি হয়ে যেতে হবে।

দুই.

২০০৬-০৭ সালের দিকে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছায়। পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়। টেন্ডারে বলে দেওয়া হয়, তেলভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ হবে তিন থেকে পাঁচ বছর। এ বিষয়ে জোর দেওয়ার অর্থ হলো, এটা একটা স্বল্পমেয়াদি সমাধান। ২০০৮ সালে টেন্ডারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১০টা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে অন্য কোনোভাবে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা যায় কি না, সেটা ভেবেছে। পরে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ আনতে গিয়ে বিশেষ দায়মুক্তি আইনে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়। ব্যাপকভাবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ায় ২০১২ সালের মধ্যে দেশ লোডশেডিং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অবস্থায় চলে আসে। এর পর থেকে ২০২২ সালের শুরু পর্যন্ত বেশ সফলভাবেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেছে। কিন্তু তেলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়নি।

তিন.

বিকল্প হিসেবে এসেছে এলএনজি, কয়লাভিত্তিক ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ। শুরুতে কয়লা আমদানির উৎস খোঁজা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলার সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে। এখন আমাদের কয়লাভিত্তিক বেশ কয়েকটি প্রকল্প হয়েছে। সেগুলো আরও আগে আসা প্রয়োজন ছিল। আমরা আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। এ ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রশ্নটা কেউ খুব একটা করছে না। নিজস্ব কয়লা উত্তোলন করতে গেলে বড় ধরনের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আমরা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। আমদানি করা কয়লার পাশাপাশি নিজস্ব উৎস থেকে উত্তোলন করা হবে কি না,
সেটি নির্দিষ্ট করেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে পরিবেশের বিষয়টি মাথায় রেখে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত সমাধান কী, সে ব্যাপারে তৃতীয় নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সমীক্ষা করা প্রয়োজন। বিদেশি কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সহনশীল পরিবেশগত ক্ষতির মাধ্যমে কয়লা উত্তোলনের প্রকৌশলগত সমাধান আছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে সময়ের আগেই সেটি উৎপাদনে চলে আসবে। কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে আমাদের ৮ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। এতে তিন-চার বছরের মধ্যে একটি স্বস্তির জায়গা তৈরি হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য অর্থনৈতিক ও নীতিগত সহায়তা থাকতে হবে। বড় আকারে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জমির প্রাপ্যতা। এক মেগাওয়াটের জন্য সাড়ে তিন একর জমি প্রয়োজন হয়। সে কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে সরকারকেই প্রাথমিক উদ্যোগটা নিতে হবে।

চার.

শীত মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা অনেকটা কমে আসে। প্রশ্ন হলো, আগামী গ্রীষ্মে কী হবে? রামপাল, পায়রা ও ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ মিলিয়ে আগামী কয়েক মাসে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চলে আসবে। ফলে আগামী গ্রীষ্মে পরিস্থিতি অনেকটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এখন গ্যাসের দাম কমে এসেছে। ইউরোপে শীতকালটা যদি তীব্র না হয়, তাহলে গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে আমরা কিছুটা সুবিধাও পাব।

বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিতে তারা সঠিকভাবে নজর দেয়নি, কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করে গেছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায়ও আমরা পিছিয়ে। অক্টোবর মাসে বিদ্যুৎ-বিপর্যয় হয়েছে। সঞ্চালন লাইন তৈরি করতে না পারায় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরো সক্ষমতা আমরা দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারিনি। পদ্মা নদী পেরিয়ে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন এখনো শেষ করা যায়নি। রামপালের বিদ্যুৎ একই সঞ্চালন লাইন দিয়ে ঢাকায় আসবে। জরুরি ভিত্তিতে এটা শেষ করা প্রয়োজন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও চার-পাঁচটা সঞ্চালন লাইন বিভিন্ন দিকে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকার দিকের লাইনটা এখনো শেষ হয়নি।

বর্তমান সংকট থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কিন্তু সংকটের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করলে আমরা আবারও ভুল করব। দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি রাখতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার ভালোভাবে বোঝে, এমন বিশেষজ্ঞদের এনে দেশে একটি পারদর্শী টিম তৈরি করতে হবে। জ্বালানির কেনাকাটায় আমরা বড় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি।

লেখক: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক
বিশেষ সহকারী