এই ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর আমাদের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি হলো, আমরা নিজের দেশ নিজের মতো সাজাতে পারি, নিজের স্বরে গাইতে পারি, নিজের ঢঙে লিখতে পারি, নিজের মতো করে বানাতে পারি সিনেমা। আমাদের নায়ক-নায়িকাদের আর উত্তম-সুচিত্রার মতো প্রেম করার প্রয়োজন নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে, ধানমন্ডির ক্যাফেতে বসে অথবা নাখালপাড়ার দুই ছাদে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে ভাষা ও আবেগে আমাদের ছেলেমেয়েরা প্রেম করে, সেভাবে আমাদের ছবিতেও তারা প্রেম করতে পারে। আমাদের গল্প, আমাদের ভাষা, আমাদের মানুষ—সিনেমাও হবে আমাদের।

এই বিশ্বাসই ২০০০ সালের পর থেকে আমাদের চিত্রভাষায় একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটায়। সংলাপের ভাষা, অভিনয়রীতি ও গল্প নির্বাচনে আসে পরিবর্তন।

নব্বইয়ের আশপাশের বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলন আর বেসরকারি টেলিভিশনকেন্দ্রিক নব উদ্দীপনা—এ দুইয়ের ধারাবাহিকতায় মাটির ময়না থেকে শুরু করে আজকের রেহানা মরিয়ম নুর

তাহলে আমাদের নেই কী? যেটা নেই, তা হলো ‘পলিসি সাপোর্ট’ বা নীতি সহায়তা। আসলে সহায়তা তো নেই-ই বরং বাধা আছে। একটা বাধা তো হলো মাল্টিপ্লেক্সের অভাব, ঢাকার বাইরে সেই অর্থে মাল্টিপ্লেক্স এখনো গড়ে ওঠেনি। আরেকটা বাধা হলো টিকিটের টাকার ন্যায্য হিস্যা। দর্শক যে টাকায় টিকিট কাটে তার সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ প্রযোজক পায়। একে একটা ভারসাম্যপূর্ণ জায়গায় আনা দরকার, যাতে হলমালিকের লোকসান না হয়, আবার প্রযোজকও খালি হাতে না ফেরেন।

তবে সবচেয়ে বড় যে বাধা, সেটা হলো স্বাধীনতার অভাব।

আমার নিজের ছবি শনিবার বিকেল আজ সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে সেন্সর বোর্ডে আটকা। চলচ্চিত্র নির্মাতারা এখন চিত্রনাট্য লিখতে বসার আগে ভাবেন, কী লেখা যাবে আর কী লেখা যাবে না, স্বাধীন চিন্তা প্রকাশের জন্য যা ভীষণ ক্ষতিকর। আমাদের বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে হবে, কিন্তু বৈশ্বিক মানের স্বাধীনতা পাব না—এটা তো একটা অসম খেলা। যে খেলায় প্রতিপক্ষ খেলবে দুই পা নিয়ে আর আমাদের এক পা থাকবে বাঁধা।

সিনেমার সেন্সর আর ওটিটি নীতিমালা—দুটোর ক্ষেত্রে কিছু অস্পষ্ট দফা ব্যবহার করা হয়েছে, যার আওতায় চাইলে যেকোনো কিছু আটকে দেওয়া সম্ভব দেশের ভাবমূর্তি, ধর্ম অবমাননা বা সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকির কথা বলে। চাইলে রাস্তায় সিগারেটের টুকরা ফেলার দৃশ্যও দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর বলে দেওয়া যেতে পারে। আবার আমার ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সমালোচনাকেও দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর ট্যাগ দিয়ে আটকে দেওয়া সম্ভব। এগুলো যখন যে ক্ষমতায় থাকবে তার খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করবে।

নিউইয়র্ক টাইমস–এ ছাপা হওয়া প্রতিবেদন থেকে জানতে পারছি, বর্ডার নামের একটি ছবি আটকে দেওয়া হয়েছে তিনটি কারণে, যার মধ্যে একটি হচ্ছে বন্ধুরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। চলচ্চিত্র নির্মাতারা এমনিতেই এত সব ভাবমূর্তির ভারে নতজানু। তার সঙ্গে এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে বন্ধুরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষার দায়। এই ব্যাপারটারও সংজ্ঞা ও আওতা পরিষ্কার নয়—কে বন্ধুরাষ্ট্র, কে শত্রুরাষ্ট্র। বাংলাদেশ তো এখন কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে নেই। তাহলে আমরা কি কোনো দেশকে শত্রুরাষ্ট্র বলতে পারি?

এবার আসা যাক, কী কী করলে বন্ধুরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা সীমান্ত হত্যা নিয়ে ছবি করা যাবে? করলে অন্য কোনো দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হবে? আমি আর কার কার ভাবমূর্তি কী কী ভাবে রক্ষা করব, নাদের আলী?

অস্পষ্ট আইন অত্যাচারের প্রধান হাতিয়ার। সেন্সর ও ওটিটি নীতিমালায় কী কী কাজ দেখালে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে, ধর্ম অবমাননা হবে, সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হবে, বন্ধুরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে—এর একটা পরিষ্কার এবং সীমায় আবদ্ধ সংজ্ঞা নির্ধারণ করা দরকার। যাতে এই বিধানগুলো ব্যবহার করে যেকোনো কিছু আটকে দেওয়া না যায়। তারপর এর ভিত্তিতে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা প্রয়োজন চলচ্চিত্র সেন্সর ও ওটিটি নীতিমালা। নিজেদের উদ্যোগে আমরা এত দূর এসেছি, আরও দূরে যেতে পারব। খালি রোডব্লক সরিয়ে নেন।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা