সেজ মামা তখন নানাবাড়ির মূল কর্তা। ১৯৮১ সালে নানা ইন্তেকাল করার পর তিনিই হাল ধরেছেন। পুরোনো ঘর ভেঙে বড় একটা দোতলা ঘর তুলেছেন। ওই এলাকায় সেটিই সবচেয়ে মজবুত ও বড় ঘর।

কিছুক্ষণ পর আকাশ মেঘলা হয়ে এল। নদী অশান্ত, ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে। ওই অঞ্চলে সে সময় কোনো সাইক্লোন শেল্টার ছিল না। ঝড়ের খবর পেয়ে গ্রামের আতঙ্কিত বহু পরিবার নানাবাড়িতে হুড়মুড় করে আসতে লাগল।

পানগুছি নদী থেকে একটা খাল ভেতরের দিকে চলে এসেছে। খালের সামনের অংশটাকে স্থানীয় লোকেরা ডাকত গোড়াখাল বলে। গোড়াখালে কয়েক ঘর খুব দরিদ্র পরিবারের বসতি ছিল। ওরা নানা সময়ে নানাবাড়িতে বিচিত্র ধরনের কাজ করেছে। সেই এলাকার পরিবারগুলো একে একে নানার ঘরে এসে আশ্রয় নিল।

একসময় সাইক্লোনের ঝাঁপটা শুরু হলো। হাওয়ার সে যে কী দাপট আর আওয়াজ! মনে হচ্ছিল, ঘরটা সবাইকে নিয়ে শূন্যে উড়ে যাবে। রাতে ঘরভরা মানুষ গুটিশুটি মেরে আছে। ছোট্ট আমার মনে কিন্তু বেশ আনন্দ হচ্ছিল। এত লোক, চারপাশে এক ভীতিপ্রদ আবহাওয়া। আমার চোখ থেকে ঘুম উবে গেল। নানি আমাকে গুড়–মুড়ি খেতে দিলেন।

জড়ো হওয়া লোকজনের মধ্যে বেশ বয়স্ক একজন নারী ছিলেন। তাঁর নাম আলাতুন্নিসা। তবে স্থানীয় লোকজন তাঁকে আলেতন বলেই ডাকতেন। তিনি পুঁথি পড়তে জানতেন। সেই ভয়ংকর রাতের ভারকে হালকা করার জন্যই কি না, কে জানে। সবাই তাঁকে ধরলেন পুঁথি পড়ে শোনাতে।

আলেতন তাঁর সুললিত কণ্ঠে সুর করে পুঁথি পড়তে শুরু করলেন। বাইরের ঝড়ের শব্দ তাঁর পুথির সুরে আর গল্পের আমেজে যেন ফুঁৎকারে উড়ে গেল। আশ্রিত সবাই কী আনন্দ নিয়ে যে পুঁথি শুনতে লাগলেন! সেই পুঁথি পড়া চলল রাতজুড়ে।

সকালে ঝড় কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ার পর সবাই বেরিয়ে এল বাইরে। চারদিকে ঝড়ের ভয়ংকর ছোবলের দৃশ্য। উঠানে কয়েক ফুট পানি উঠেছে। নদীর কাছের রাস্তা ভেঙেচুরে একাকার। পুরোনো বড় বড় গাছ মাটিতে লুটিয়ে আছে। চারপাশে শুধু কান্নার ধ্বনি। রেডিওতে আসছে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ সব তথ্য। নদীর তীরে মামাদের ব্যবসার বড় বড় যে নৌকা বাঁধা ছিল, ভেসে সেগুলো কোথায় চলে গেছে তার খোঁজ নেই।

গোড়াখালে আলেতন গিয়ে দেখলেন, তাঁর বাড়িঘর সব নদীগর্ভে চলে গেছে। সেই শূন্যতা দেখে আলেতন যেভাবে আর্তচিৎকার করে উঠেছিলেন, আমার অন্তরে তা বিঁধে আছে।

গোড়াখাল এখন যেন কোনো স্বপ্নের কথা। নদী তাকে খেয়ে ফেলেছে! পুঁথি পাঠ করা সেই আলেতনও কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তবু শৈশবে সেই আতঙ্কের দিনে আনন্দ দিয়ে সবাইকে নির্ভয় করে তোলা আলেতনের স্মৃতি এখনো সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।