কয়েক মাস আগে ঢাকার এক বড় সুপারশপে কফির তাকের দিকে নজর গেল। সব কফি নর্থ এন্ডের। গুঁড়া ও বিন দুই রকমই আছে। কোনোটা ফুল রোস্টেড, কোনোটা হাফ রোস্টেড। সেই তাকে দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ল ‘হিল ট্র্যাক্ট ব্লেন্ড’ লেখা প্যাকেট। নিচে লেখা ‘বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের কফি! তা–ও আবার নর্থ এন্ড বাজারজাত করছে। চায়ের জন্য আমাদের পরিচিতি থাকলেও কফির দেশ তো বাংলাদেশ না। তাই নর্থ এন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ।

জানা গেল, পাঁচ–ছয় বছর হলো বাংলাদেশের পাহাড়ি কফি বাজারজাত করছে নর্থ এন্ড। এই কফি সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণের পুরো বিষয়টির দেখভাল করেন নর্থ এন্ডের হেড অব ক্যাফে প্রচ্ছদ দে। শাহজাদপুরে তাঁদের প্রথম শাখায় বসে তাঁর সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। বললেন, ‘আমাদের পাহাড় থেকে রোবাস্তাই পাই বেশি। এই কফি একটু শক্ত। পানের সময় কড়া। ক্যাফেইনের পরিমাণও এতে বেশি। যাঁরা একটু কড়া কফি পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য রোবাস্তাই ভালো। আর পরিমাণেও লাগে কম। দেশি কফির চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। বছরে আমরাই প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি কফি বিন সংগ্রহ করি বান্দরবান থেকে। বান্দরবানের রুমাতেই কফি উৎপাদন হয় বেশি। ২০২৫ সাল নাগাদ পাহাড়ি এলাকার কফির চাহিদা অনেক বাড়বে।’

কিন্তু বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে কফি এল কী করে? সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে রাঙামাটির কারুশিল্প এবং কফি ও কাজুবাদাম উদ্যোক্তা শিরীন সুলতানার কয়েকটি লেখায় কিছু ধারণা পাওয়া যায়। তিনি জানাচ্ছেন, কথিত আছে, প্রায় এক শতাব্দী আগে ভারতের মিজোরাম থেকে আসা মিশনারিরা কফিবীজ নিয়ে এনে বান্দরবানের রুমায় বপন করেন। ধারণা করা হয়, সেই সময় থেকে রুমায় বাড়ির আঙিনায় কফি উৎপাদন শুরু হয়।

‘আমাদের মানে, বমদের আগে থেকেই কফি উৎপাদনের অভিজ্ঞতা আছে। মুরব্বিদের দেখতাম বাড়ির আশপাশে অন্তত পাঁচ–ছয়টা কফির গাছ লাগাতে। গাছে কফি পাকার পর শুকিয়ে, আগুনে ভেজে নিতেন তাঁরা। লালচে হয়ে গেলে ঢেঁকিতে গুঁড়া করা হতো। এরপর গরম পানি দিয়ে চা তৈরির কায়দায় কফি বানিয়ে পান করা হতো।’ মুঠোফোনে এভাবেই বান্দরবানের কফির ঐতিহ্যের একটা ধারণা দিলেন ফুংখাল বম। সড়ক ও জনপথ বিভাগের চাকুরিজীবী ফুংখাল বম। কফি উৎপাদনে তাঁর বিশেষ আগ্রহ আছে।

ফুংখাল বম বললেন, ‘আমি চিম্বুক এলাকায় কয়েক বছর আগে কফির চাষ শুরু করি। এগুলো অ্যারাবিকা কফি। চিম্বুকে মুরংরাও এখন এই কফি উৎপাদন করে। সরকার এবং কিছু এনজিও কফি চাষের নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার যে চারাগুলো দিয়েছে, সেগুলোর ফলন হতে আরও কয়েক বছর লাগবে।’

শিরীন সুলতানার প্রতিষ্ঠানের নাম এস এস অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট। অনলাইনেও পার্বত্য অঞ্চলের কফি বিক্রি করে এই প্রতিষ্ঠান। শিরীন বললেন, ‘পাহাড়ের কফির স্বাদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে যাঁরা স্বাস্থ্যসচেতন এবং ব্ল্যাক কফি পান করেন, তাঁরা আমাদের পাহাড়ে উৎপাদিত কফি পছন্দ করছেন বেশ। ধীরে ধীরে চাহিদা বাড়ছে।’

ইনস্ট্যান্ট কফি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে কফিপ্রেমের শুরু, তা বেশ আগেই কফি শপে তাজা কফিবীজ থেকে তৈরি কফির দিকে ঝুঁকেছে। কফি শপ কিংবা ক্যাফেতে বসা, কফি পান এখন নগরজীবনের অনুষঙ্গ। এই নাগরিক চাহিদা মেটাতে তৈরি আমাদের পাহাড়। পাহাড়ের কফি হয়তো একদিন বিদেশও মাতাবে। বাংলাদেশের কফি রপ্তানি করার কথা ভাবছে নর্থ এন্ড।  

লেখক: প্রথম আলোর হেড অব নিউ ইনিশিয়েটিভ