উপরিউক্ত তিনটি সংগঠনই নীতি ও কৌশল থেকে শুরু করে রোল মডেল সৃষ্টির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থা বহুলাংশে প্রভাবিত করেছে এবং সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় সরকারি খাতের ‘প্রসারিত হাত’ হিসেবে কাজ করেছে। এই মেলবন্ধনের নীতি ও কৌশল নির্ধারণে দিকনির্দেশনামূলক তথ্য ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।

পিয়ার-রিভিউড জার্নালে যথাযথভাবে প্রকাশ না করায় আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা কম থাকলেও আরও বেশ কিছু বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন স্বাস্থ্য গবেষণা–সম্পর্কিত নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে আইইডিসিআর, নিপসম, নিপোর্ট, বিআইডিএস, আইএনএফএস, আইএইচইসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ইনস্টিটিউট ও বিভাগ, সিএইচআরআই, বিআরআরআই, বিএআরআই, বিসিএসআইআর, অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন এবং কিছু পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও বিভাগ।

অনেক ইতিবাচক দিক সত্ত্বেও স্বাস্থ্য গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পশ্চাদপদতা সুবিদিত, এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়। দেশেও জ্ঞানবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা, বিশেষত কৃষিবিজ্ঞানের তুলনায় স্বাস্থ্য গবেষণা অনেক পিছিয়ে। সাম্প্রতিক যেকোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক র​্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকালে তা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। অথচ বাংলাদেশে উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখার পূর্বশর্ত হচ্ছে শ্রমভিত্তিক অর্থনীতি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিণত করা; আর বর্তমান যুগে তেমন একটি সমাজের অন্যতম প্রধান একটি উপাদান হচ্ছে মৌলিক বায়োমেডিকেল ও স্বাস্থ্য গবেষণা উদ্ভূত সম্পদ। 

বায়োমেডিকেল ও স্বাস্থ্য গবেষণায় এ গুরুত্ব স্বাধীনতার শুরু থেকে অনুভূত হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ আগ্রহে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল বা বিএমআরসি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের (আইসিএমআর) বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করলে এটা সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে ঐতিহাসিক এই গুরুদায়িত্ব বিএমআরসি পালন করে উঠতে পারেনি। বর্তমান বাস্তবতায় সে দায়িত্ব পালন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য গবেষণায় একসময় নেতৃত্ব দিলেও তাদের প্রতিটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের স্বর্ণযুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। 

সবচেয়ে বড় কথা, বেসরকারি স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেবল পথ প্রদর্শন করতে পারে, তারা পুরো সরকারি খাতের বিকল্প হতে পারে না। সরকারের সার্বিক স্বাস্থ্য–সম্পর্কিত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গবেষণাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া তাই জরুরি হয়ে পড়েছে। আশার বিষয়, সে প্রক্রিয়া কিছু মাত্রায় শুরু হয়ে গেছে। কোভিড ১৯– এর যে প্রভাব পড়েছে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তা স্বাস্থ্যবিষয়ক বহুমুখী গবেষণার গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই উদ্যোগ নিয়ে ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য গবেষণা প্রকল্প চালু করে এর আওতায় প্রতিবছর ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে, বিশেষত বিএসএমএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল ভবনের উদ্বোধনের সময় তিনি মেডিকেল গবেষণার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। 

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে শিক্ষা ও সেবার পাশাপাশি ‘গবেষণা’র সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এবং সেগুলোর পরিকল্পনায় গবেষণার অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব ইতিবাচক নতুন বিষয়ের সঙ্গে আগে থেকে প্রচলিত বিএমআরসির বিভিন্ন রিসার্চ গ্র্যান্ট, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এইচপিএনএসপি প্রকল্পের বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যানে গবেষণার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা অধিদপ্তর ও দেশি-বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে গবেষণা অনুদানের সুযোগ ইত্যাদি যোগ করলে অবকাঠামো ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা এখন এ দেশে স্বাস্থ্য গবেষণার প্রধান অন্তরায় বলে প্রতীয়মান হয় না। প্রয়োজন শুধু উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনার।

এ দেশে স্বাস্থ্য গবেষণার মূল প্রতিবন্ধকতা হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা। এ পেশার মানুষেরা নিজেদের প্রায় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসী ভেবে থাকেন এবং স্বাস্থ্য যে মৌলিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান এমনকি সৃজনশীল শিল্পকলা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত, তা আমাদের সমাজের অনেকে মনে করেন না। এগুলোর সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া উচ্চপর্যায়ের স্বাস্থ্য গবেষণা কখনো সম্ভব হবে না; তাই পারস্পরিক সংযোগের পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। 

স্বাস্থ্য গবেষণার আরেকটি অন্তরায় হচ্ছে প্রাইভেট প্র্যাকটিস। চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে গবেষণা অবিচ্ছেদ্য করে যেসব স্বাস্থ্য পেশাজীবী শিক্ষক হতে চান, তাঁদের বাস্তবসম্মত প্রণোদনার মাধ্যমে নন-প্র্যাকটিস বা ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের মধ্যে না আনতে পারলে ফলপ্রসূ ও প্রয়োগযোগ্য স্বাস্থ্য গবেষণা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সফল হবে না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের নিছক বাণিজ্যিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে ও সামাজিক সম্মানের মাধ্যমে গবেষকদের উৎসাহিত করতে হবে। তা হলেই কেবল সমাজের অন্য মানুষেরা তাঁদের আপন করে নেবেন, সম্মান করবেন। 

লেখক: চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ