দুজনই কিছুক্ষণ চুপ থেকে ওকে ডেকে পাশের দোকান থেকে একটি চেয়ার নিয়ে বসতে বলি। নাম-ঠিকানা জানতে চাই। বলি, ‘কিছু খাবে?’

মাথা নেড়ে না–সূচক উত্তর দিয়ে সে বলে, তার নাম আরিয়ান, বাড়ি ভাটশালা গ্রামে।

ঠিকানা জেনে আরও অবাক হই। কারণ, ভাটশালা একদম কাছে নয়। শহরের ভৈরব নদ পেরিয়ে যেতে হয়। সেতু দিয়ে যেতে তা ১০-১২ কিলোমিটার হবে। বলি, ‘এত রাতে বাড়ি যাবে কীভাবে, অনেক পথ তো?’ ছোট্ট আরিয়ান হেসে বলে, ‘আমি যাতি পারব। রাস্তা চেনা আছে। বাজারের খেয়া পার হয়ে হেঁটে চলে যাব।’

এই রাতে এত পথ কীভাবে হেঁটে যাবে এই ছেলে, সেই কথা ভাবছিলাম। আবার প্রশ্ন করলাম, ‘শাক বিক্রি করছ কেন?’ প্রশ্নের মধ্যেই কী যেন মনে হলো, পকেট থেকে ফোনটা বের করে ভিডিও করতে শুরু করি।

আরিয়ান বলে, ‘কী করব, ঘরে এট্টুও চাইল নেই।...তাই শাগ বেচতি আইছি কয়টা।’

কথায় কথায় আরিয়ান জানায়, শহরে রাস্তার পাশে অনেকে শাক বিক্রি করে। তা সে আগে দেখেছে। তাই গ্রামের একটি খালের পাশ থেকে শাক তুলে বিক্রির জন্য সকালে নদী পার হয়ে শহরে আসে। এক রাস্তার মোড়ে বসেও ছিল কিছুক্ষণ, তবে বিক্রি না হওয়ায় হেঁটে হেঁটে ঘুরতে থাকে রাস্তায়। এভাবে বিক্রিও হয়, তবে ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে।

দুই আঁটি শাক আর বিক্রির ৮০ টাকা নিয়ে আরিয়ান হাঁটছিল শহরের শালতলা এলাকার রাস্তা দিয়ে। সেখানে একটা গেট ঘিরে বেশ জটলা দেখে উঁকি দেয়। ভেতরে চলছিল বৈশাখী মেলা। সেখান থেকে মায়ের জন্য একটি চামচ আর লবণ রাখার প্লাস্টিকের কৌটা কিনেছে। এতে তার শাক বিক্রির ৮০ টাকা শেষ।

‘এই দুই আঁটি বেচা হলি তা-ই দিয়ে আম্মুর জন্যি চাইল কিনে নিয়ে যাব।’ দুই আঁটি শাক বিক্রির টাকায় চাল কেনা হবে? তার সরল উত্তর, ‘যে কয়টা হবে, সেই কয়টা কেনব। তা হলি তো না খাইয়ে থাকতি হবেনে।’

এরপর আরিয়ানকে নিয়ে বাজারে যাই। চাল, ডাল, তেল, আলুসহ সামর্থ্য অনুযায়ী নিত্যপণ্য কিনে আমার সেই বন্ধুকে নিয়ে ছুটি আরিয়ানের বাড়িতে।

আরিয়ানকে নিয়ে আমরা যখন ওদের গ্রামে যাই, রাত তখন প্রায় সাড়ে ১০টা। ওর মা তখন আরিয়ানকে খুঁজতে পাশের বাড়িতে। ওদের খুপরির দরজা বন্ধ। ‘ও আম্মু, আম্মু’ বলে কয়েকটা ডাক দিয়ে না পেয়ে আরিয়ান যায় পাশের বাড়ি। ‘ও আরিয়ান, কোথায় গেছিলি’, বলেই ছেলের পিঠে এক থাপ্পড় দেন। আরিয়ান আমাদের দেখিয়ে বলে, ‘এই মামারা চাইল কিনে দিছে।’ কথা হয় আরিয়ানের মা পিয়া আক্তারের সঙ্গেও।

ফিরতি পথে শুধু কানে বাজছিল আরিয়ানের কথাগুলো। ‘আমি শুধু ভাত নুন দিয়েও খাতি পারি। কোনো কষ্ট হয় না।’ ওর কণ্ঠের সেই কথাগুলো সারা রাতই কানে বাজে। সকালে ঘুম থেকে উঠে লিখতে বসি সেই অভিজ্ঞতা। পরদিন দুপুরে প্রথম আলোর অনলাইনে প্রকাশিত হয় আরিয়ানের সেই গল্প।