সর্বনিম্ন ২০ একর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৮০০ একর পর্যন্ত হতে পারে পাড়াবন। ঘরবাড়ি নির্মাণের বাঁশ, গাছ, পানির উৎস ধরে রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য, ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাসস্থান রক্ষা—এসব জরুরি প্রয়োজন থেকেই সংরক্ষণ করা হয় পাড়াবন। প্রতিটি পাড়ার পাড়াবন রক্ষার জন্য রয়েছে কমিটি। কমিটির অনুমতি ছাড়া বন থেকে গাছ, বাঁশ বা কোনোকিছুই সংগ্রহ করা যায় না। বন্য প্রাণী শিকার, জলজ প্রাণীও আহরণ করা যাবে না। কেউ এই নিয়ম ভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তি ও জরিমানা। 

৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে প্রতিটি পাহাড়ি পাড়াতেই ছিল পাড়াবন। নানা কারণে অনেকে সেই ঐতিহ্য আর ধরে রাখতে পারেনি। যেসব পাড়ায় পাড়াবন নেই, সেখানে উষ্ণ হয়ে ওঠা পরিবেশে পানির উৎস দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, বন্য প্রাণী ও বনের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র। পানির সংকটে ভবিষ্যতে ওই পাড়াগুলোর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠবে।

মংয়ো খুমিপাড়ার হয়রে খুমি ও রিংকু খুমির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের পাড়াটি ২০০ বছরের বেশি পুরোনো। ৪৭ একরের পাড়াবনটি পাড়ার চেয়েও প্রাচীন। রেনিক্ষ্যংপাড়ার কার্বারি (পাড়াপ্রধান) রিংরাউ ম্রো জানান, বনাঞ্চলে ছায়ায় তাঁদের ঝিরি ও ঝরনাগুলোতে পানির প্রবাহ শুকনো মৌসুমে কিছুটা কমলেও সারা বছর পানির কোনো সমস্যা হয় না। অপরদিকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ম্রোলংপাড়ায় কোনো পাড়াবন না থাকায় বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় পানির তীব্র সংকট থাকে।

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিখিল চাকমা বলেছেন, পাড়াবন ঐতিহ্যে প্রতিটি পাড়ায় ক্ষুদ্রায়তনের জলবায়ু অঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব। ওই জলবায়ু অঞ্চলে পানিকাঠামো (ওয়াটারশেড), প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ (ইকোসিস্টেম) অটুট থাকে। 

২০২১ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি পাড়াবন উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্যের আধার। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় পাড়াবনগুলো উদ্ভিদ সংরক্ষণাগার ও বন্য প্রাণীর আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। সেখানে ৫৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ৩৬৯ প্রজাতির বন্য প্রাণী ও ১৬৩ প্রজাতির বৃক্ষ পাওয়া গেছে। বিলপ্তপ্রায় প্রাণীর মধ্যে ভারতীয় পেঙ্গুলিন, নীলগলা গিরগিটি, লেঙ্গুর, মায়াহরিণ, বড় আকারের কালো কাঠবিড়ালিসহ আরও অনেক প্রজাতির প্রাণী পাওয়া গেছে। একমাত্র প্রাকৃতিক বনাঞ্চলেই এগুলো টিকে থাকে। 

পাড়াবনের এই ঐতিহ্য পেয়েছে ‘পরিবেশের নোবেল’খ্যাত অস্ট্রিয়ার এনার্জি গ্লোব অ্যাওয়ার্ড। ২০১৬ সালে ১৭৮ দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশ থেকে বান্দরবানের বেসরকারি সংস্থা তাজিংডংয়ের পাড়াবন সংরক্ষণমূলক একটি প্রকল্পকে দেওয়া হয় সম্মানজনক এই পুরস্কার। ইউএনডিপি ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন প্রতিটি পাড়ায় পাড়াবনের ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের আয়তন বাড়ানোর জন্য কাজ করছে।

ঐতিহ্যগত পাড়াবনকে গবেষকেরা নাম দিয়েছেন গ্রামীণ সাধারণ বন (ভিলেজ কমন ফরেস্ট বা ভিসিএফ)। তিন পার্বত্য জেলার ৩৮৫টি পাড়ায় এ রকম ভিসিএফ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাঙামাটিতে ১৬২টি, বান্দরবানে ১৬১টি ও খাগড়াছড়িতে ৬২টি পাড়াবনে ৪৫ হাজার ৬ একর বনাঞ্চল রয়েছে। পাড়াবনবিহীন পাড়াগুলো তীব্র পানির সংকটে পড়েছে। এ জন্য অনেক পাড়াবাসী নতুন করে পাড়াবন সংরক্ষণ করছেন। অনেক পাড়াবাসী পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার গবেষক অংশৈসিং মারমা বলেন, পাড়াবনের ঐতিহ্য অনুসরণ করে সমতল অঞ্চলেও পতিত জমিতে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সৃজন ও সংরক্ষণ করা সম্ভব।’

লেখক: প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি