কিন্তু এই আলোয় উজ্জ্বল ছবির উল্টো দিকের চিত্রটিও আমাদের দেখতে হবে। খাদ্য নিয়ে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণের যে সাংবিধানিক অঙ্গীকার, তার কতটা আমরা পূরণ করতে পেরেছি—সে প্রশ্ন নিজেদের করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে আমরা নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার বৈষম্য কমানো এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছি। এসব অঙ্গীকার আমরা কতটা রাখতে পারলাম?

একদিকে পুষ্টি অবস্থার উন্নতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে চোখে পড়বে, পুষ্টির বৈষম্যে ব্যবধানও বেড়ে চলেছে এবং পুষ্টির এই সাফল্য শ্রেণি, অঞ্চল ও নর–নারীভেদে অসম। যেমন খর্বকায়ত্ব বা বয়স অনুপাতে উচ্চতার গড় সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো, অথচ শ্রেণি ও অঞ্চলভেদে এ ক্ষেত্রে বড় রকমের বৈষম্য থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০১৭-১৮ অনুযায়ী, আর্থসামাজিক অবস্থানে পিছিয়ে থাকাদের মধ্যে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা প্রতি ১০ জনে ৪ জনের বেশি। অথচ উচ্চ উপার্জনক্ষম স্তরে এই সংখ্যা দুইয়ের নিচে। জন্মের পর থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশু অনাহার বা স্বল্পাহারে থাকলে সে খর্বকায় হয়ে পড়ে। বিডিএইচএসের এই জরিপ বলছে, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিশুরা উচ্চ অবস্থানে থাকা শিশুদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অনাহারে থাকে।

শিশুদের বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্য গ্রহণের ছবিটিও একই রকম বৈষম্যপূর্ণ। নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে প্রতি ১০ জনে মাত্র দুজন শিশু বৈচিত্র্যময় খাবার খেতে পারে। বিপরীতে উচ্চ আয়ের পরিবারে প্রতি ১০ জনে ৫ জনের বেশি শিশু এ সুযোগ পায়। ভিটামিন এ এবং অন্য অনুপুষ্টিসম্পন্ন খাবার নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে সুলভ নয়। নারীদের স্বাস্থ্যচিত্রও একই। বিডিএইচএসের জরিপ বলছে, উচ্চ আয়ের পরিবারে মায়েদের পুষ্টি অবস্থা নিম্ন আয়ের পরিবারের চেয়ে উন্নত।

অঞ্চলভেদে পুষ্টি তারতম্যের ছবিটি সিলেট দিয়ে শুরু করা যাক। সিলেট অঞ্চলে দারিদ্র্য কমেছে সবচেয়ে বেশি হারে, অথচ সেখানে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৪৩ শতাংশ। এর পরপরই আছে ময়মনসিংহ। সাদাচোখে দেখা যাচ্ছে যে হাওরাঞ্চলে অপুষ্টির ব্যাপকতা বেশি। আবার দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য অনিরাপত্তার বিচারে সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের অবস্থান সবচেয়ে খারাপ। বছরের বেশির ভাগ সময় এ অঞ্চলের মানুষ অর্ধাহারে বা অনাহারে কাটাতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বস্তি ও চা-বাগানের মতো বিশেষ কিছু এলাকার পুষ্টির অবস্থা অসম্ভব শোচনীয়।

কয়েক বছর ধরে অপুষ্টির আরেক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে নারীদের ওজনাধিক্য আর স্থূলতায়। এর অন্যতম কারণ শর্করা এবং স্বল্প ভিটামিন ও মিনারেলপুষ্ট খাদ্য গ্রহণের আধিক্য। অতিরিক্ত ওজনের কারণে অনেকে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। পুরুষদের মাত্র ১৬ শতাংশ যেখানে ওজনাধিক্যে ভুগছে, নারী ভুক্তভোগীর হার সেখানে প্রায় ২৬ শতাংশ।

দেখা যাচ্ছে, দেশব্যাপী পুষ্টির এই বৈষম্যের শ্রেণি, অঞ্চল ও লিঙ্গভেদ আছে। নিম্ন আয়ের মানুষ, নারী আর পিছিয়ে থাকা অঞ্চল পড়ে আছে বৈষম্যের তলায়। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সুনির্দিষ্ট এসব গোষ্ঠী ও অঞ্চলের মানুষের সংখ্যা কম নয়। তাদের পুষ্টি অবস্থার উন্নতি ঘটাতে না পারলে বিপুলসংখ্যক মানুষ জনসম্পদে তো পরিণত হবেই না, উল্টো দেশের জন্য গুরুভার হয়ে থাকবে। দেশের এগিয়ে যাওয়া পদে পদে ব্যাহত করবে। শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি অবস্থা উন্নত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এবং তা বাস্তবায়ন করে কোনো দেশকে কোথায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, আমাদের চোখের সামনে তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ চীন।

বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সব মানুষের পুষ্টি অবস্থা উন্নত করার জন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

আসফিয়া আজিম: পুষ্টিবিদ