ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার বাসা কোথায়? বাসায় মায়ের সঙ্গে কি রাগ করে এসেছ?’ ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল, ‘আমার মা-বাপ যে কই থাহে আল্লায় ছাড়া কেউ কইতারতো না। বাসা কই যে রাগ কইরা ছাইড়া আমু? পুরা বাংলাদেশই আমার বাসা।’

কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম ওইটুকু চানাচুরে ওর খিদে মিটবে না। ব্যাগে ছোট একটা বিস্কুটের প্যাকেট আর পানি ছিল। বের করে ওকে দিলাম।

ছেলেটা বলল, ‘ভাই, আমনেও একটা বিস্কুট নেন।’ বেশ বুঝতে পারছিলাম, ওই ছোট বিস্কুটের প্যাকেটে ভাগ বসালে আমার পেট তো ভরবেই না, উল্টো ওই বালকটিই অভুক্ত থেকে যাবে। তাই বিস্কুটে ভাগ না বসিয়ে ব্যাগ থেকে একটা গল্পের বই বের করলাম।

বইটাতে মাঝেমধ্যে চোখ বোলাচ্ছি আর গল্প করছি ছেলেটার সঙ্গে। ও জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই, আমনের নাম কী?’ বললাম, ‘অমিত।’

ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে একে একে আমার বন্ধুরা চলে এল। এর মধ্যে ট্রেনও চলে এসেছে। ছেলেটাকে বিদায় দিয়ে আমরা ট্রেনে উঠে গেলাম। ঘটনার সেখানেই ইতি।

বহুদিন পার হয়ে গেছে। জরুরি কাজে একবার চট্টগ্রাম যাচ্ছি। সঙ্গে বন্ধু অজয়। ট্রেন আমাদের পছন্দের। ট্রেনে করেই যাচ্ছি। রাতের ট্রেন শনশন করে ছুটে চলেছে। স্টেশনে স্টেশনে থামছে।

যাত্রীরা নামছে, উঠছে। আমরা আধো ঘুম, আধো জাগরণে। এক স্টেশনে আকস্মিক আতঙ্কে ঘুম পগার পার হয়ে গেল। কোত্থেকে একদল বখাটে ট্রেনে উঠে এসেছে। যাত্রীদের সঙ্গে ভীষণ উৎপাত শুরু করেছে। অজয় নির্বিরোধ ছেলে। ভয়ে সে অস্থির। এক বখাটে এসে আমাকে ভীষণ জোরে একটা ধাক্কা দিল। সিট থেকে আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। তক্ষুনি পেছন থেকে কে যেন আমাকে শক্ত করে ধরে ফেলল।

তাকিয়ে দেখি অল্প বয়সী একটা ছেলে। ছেলেটির দিকে তাকাতেই ও বলল, ‘অমিত ভাই না?’

কোন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি, জানি না। রাতের আঁধারে ও রকম পাণ্ডববর্জিত অঞ্চলে অচেনা মানুষের মুখে আমার নাম শুনে একেবারে চমকে গেলাম। ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি।

ওদিকে ছেলেটা ওই দঙ্গলের পান্ডা গোছের একজনের সঙ্গে আমার কথা বলতে শুরু করেছে। সম্ভবত ওদেরই বড় ভাই বা লিডার।

ছেলেটা বলছে, ‘তাইনের কতাই কইছিলাম। ওই যে ঢাকায় আমারে খাইতে দিছিল। তাইনেই অমিত ভাই।’

মধ্যরাতে অচেনা স্টেশনে আমি হতবিহ্বল হয়ে রইলাম।