জনগণকে স্বাস্থ্য সচেতন করে গড়ে তোলা, সে অনুযায়ী জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত ও প্রণোদিত করা, তেমন জীবনকে সহজতর করা এবং সে লক্ষ্যে নীতিনির্ধারণ করা জ্ঞানকাণ্ডের যে শাখার অভীষ্ট, তার নাম জনস্বাস্থ্য। মুখে মুখে আমরা যতই বলি আর মুখস্থ রচনায় যতই ওগরে দিই ‘রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’, আমাদের জীবনবীক্ষায় এর প্রতিফলন খুবই নগণ্য। স্বাস্থ্য বলতে আমরা মূলত বুঝি অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং সে বাবদ ওষুধ ও প্রয়োজনীয় শল্যচিকিৎসাপ্রাপ্তি। কিন্তু এর বাইরেও যে স্বাস্থ্যের বিশাল এক ক্ষেত্র রয়েছে, তা আমাদের সমাজবোধ ও নীতিনির্ধারণী কার্যতালিকায় প্রায় অনুপস্থিত। কোভিড-১৯ অতিমারিতে তাই সাংবাদিকদের মেডিসিন বিশেষজ্ঞের সামনে মাইক বাড়িয়ে প্রশ্ন করতে শুনি, ‘স্কুল কবে খুলে দেওয়া সংগত হবে?’ চিকিৎসক অসুস্থকে সারিয়ে তোলেন, কিন্তু স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ণায়ক, রোগ প্রতিরোধের ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক নীতিমালা, রোগের সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া ইত্যাদি মূলত জনস্বাস্থ্যবিদের কাজ, চিকিৎসকের নয়। 

আমাদের নীতিনির্ধারকেরা যেভাবে ‘জনস্বাস্থ্য’নামক অভিধাটিকে অপব্যবহার করেছেন, তা দুঃখজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির কাজ হচ্ছে টিকা, সেরাম, স্যালাইন, রিএজেন্ট ইত্যাদি প্রস্তুত করা; এসব জৈবপণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা; খাদ্য ও পানীয় পরীক্ষাগার-বিশ্লেষণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করা; হাম, পোলিও, রুবেলার মতো সংক্রামক রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষাগার সহায়তা প্রদান ইত্যাদি। আরও কিছু জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কাজের উল্লেখ আছে, যা অনির্দিষ্ট ও অস্পষ্ট। 

পক্ষান্তরে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘টোয়েন্টি ফাস্ট সেঞ্চুরি হেলথ চ্যালেঞ্জেস: ক্যান দ্যা অ্যাসেনশিয়াল পাবলিক হেলথ ফাংশানস মেইক এ ডিফারেন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনের অপরিহার্য জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের তালিকায় নজর দেওয়া যাক। এ রিপোর্ট অনুযায়ী জনস্বাস্থ্যের কার্যক্রমের মধ্যে পড়ে জনগণের স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবার পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন, জনস্বাস্থ্য সংকট ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্যে সুশাসন ও আইনকানুনের সুষ্ঠু প্রয়োগ, দক্ষ ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পেশা ও পরিবেশগত হুমকি মোকাবিলা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও দ্রুত নির্ণয়, স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ণায়কগুলোর ওপর নজর দিয়ে অসাম্য নিরসন, কমিউনিটির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়ন, জনস্বাস্থ্য মানবসম্পদের সংখ্যা ও গুণগত মান বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার মান ও অভিগম্যতা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য গবেষণার অগ্রগতি এবং অপরিহার্য ওষুধ ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তির ন্যায়সংগত অভিগম্যতা ও যুক্তিসংগত ব্যবহার নিশ্চিত করা। 

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের নাম শুনে কেউ যদি এর কাজ সম্পর্কে খোঁজখবর করেন, তাহলে তাঁর ধারণা জন্মাবে, জনস্বাস্থ্য মানে হলো টিকা ও স্যালাইন তৈরি করা। একইভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নাম ও কাজ মিলিয়ে যে কারও মনে হতে পারে, জনস্বাস্থ্য হলো কেবল নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্যানিটারি ল্যাট্রিন স্থাপন করা। এদিকে চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়গুলোতে যে বিষয়ের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের জনস্বাস্থ্যের জ্ঞান সরবরাহ করা হয়, বিচিত্রভাবে সে বিষয়টির নামকরণ করা হয়েছে ‘কমিউনিটি মেডিসিন’, পাবলিক হেলথ বা জনস্বাস্থ্য নয় (দীর্ঘ উপরোধের পর অতি সম্প্রতি যে কারিকুলাম প্রণীত হয়েছে, সেখানে অবশ্য নামটি সংশোধন করা হয়েছে)। 

বাংলাদেশের বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে আবেদনের একমাত্র যোগ্যতা হলো চিকিৎসক হওয়া, অথচ স্বাস্থ্য খাতের সুবিশাল কর্মযজ্ঞের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম, যার মূল্যায়ন এবং পেশাগত অগ্রযাত্রার সুযোগ বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নেই বললে চলে। 

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসা-নৃবিজ্ঞানী আর্থার ক্লাইনম্যান তাঁর বিখ্যাত দ্য ইলনেস ন্যারেটিভ গ্রন্থে বলেন, কেবল রোগ নির্ণয় ও ওষুধ দেওয়ার মাধ্যমে অসুস্থ ব্যক্তিকে সারিয়ে তোলা যায় না। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা যেন মানুষকে একটি নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রের মতো মনে করে, যেখানে চিকিৎসকের কাজ হলো বাহ্যিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রটির ত্রুটি নির্ণয় করা, ঠিকঠাক করা এবং বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া। কিন্তু মানুষ তো প্রকৃতপক্ষে যন্ত্র নয়। যখন আমরা অসুস্থ হই, আমরা অসুস্থতার এক বিশেষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাত্রা করি; সে যাত্রা ভয়ের, যন্ত্রণার, উৎকণ্ঠার, ক্লান্তির, তিলে তিলে ক্ষয়ে যাওয়ার। আমাদের অসুস্থতা কেবল জৈবিক নয়, মানবিকও। অথচ আমাদের বায়োমেডিকেল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ‘চিকিৎসা’ নামক প্রপঞ্চটি অবলীলায় উপেক্ষা করে যায় জনস্বাস্থ্যের বৃহত্তর বায়োসোশ্যাল বা জৈবসামাজিক বাস্তবতাটিকে। 

এমন একটি মনোসামাজিক বিপর্যয় থেকে উত্তরণ সহজ নয়, স্বল্পমেয়াদিও নয়। অথচ এই উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা কোভিড-১৯ অতিমারির অভিঘাত থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। এ অতিমারির শিক্ষা যদি আমরা আমাদের জনস্বাস্থ্যের অগ্রযাত্রায় সম্যক ব্যবহার করতে না পারি, তবে তা হবে এক ক্ষমাহীন ভ্রষ্ট সুযোগ। 

লেখক: জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক