রাজনীতিকে নির্বাচনমুখী করার একটা চেষ্টাও যে জোরদার হবে, তা সহজেই অনুমেয়। এর মাধ্যমে জনজীবনের সংকট ও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোর যে ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করা হয়েছে, সেসব বিষয় থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া সহজ। কথিত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও ধারাবাহিকতার যুক্তিতে রাজনীতিকে নির্বাচনমুখী করার চেষ্টা ক্রমেই যে জোরালো হচ্ছে, তার লক্ষণগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি। সরকার ও নির্বাচন কমিশন কে অংশ নেবে আর কে নেবে না, তার অপেক্ষায় নির্বাচন ঠেকে থাকবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আনুষ্ঠানিকতা পূরণই যে গণতন্ত্র নয়, সেই সত্য উপেক্ষা করে তৃতীয়বারের মতো দেশ শাসনের ধারণা খুবই বিপজ্জনক।

রাজনীতি নির্বাচনমুখী হওয়ার মানেই যে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত হওয়া নয়, তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেই যে তাকে নির্বাচন বলা যায়, তা-ও নয়, যেমনটি ২০১৮–তে ঘটেছে। ২০১৪ সালে রাজনীতি নির্বাচনমুখী ছিল না, বরং ছিল সংঘাতপূর্ণ। অনেকগুলো কারণের মধ্যে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপ ছিল রাজনৈতিক সংঘাতের কারণ। আওয়ামী লীগের বহুল চর্চিত সহিংস আন্দোলনের পথ অনুকরণ করতে গিয়ে বিএনপি করুণভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ক্ষমতার বাইরে থাকা সব দল নির্বাচন বর্জন করলেও বিএনপি কোনো বৃহত্তর ঐক্য গড়তে না পারায় নির্বাচন ঠেকানোর বদলে বিনা ভোটেই আওয়ামী লীগের শাসনকালের বিতর্কিত নবায়ন ঘটে। ২০১৮–তে বিএনপি সংলাপে অংশ নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় আদায় ছাড়াই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে দলগুলোর অংশগ্রহণ হয় ঠিকই, কিন্তু ভোটাররা ভোটের সুযোগ পাননি। আগের রাতেই পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় ফল নির্ধারণ হয়ে যাওয়ায় বহুল নিন্দিত নির্বাচন কমিশনও ‘রাতের ভোট’ বিশেষণটি মেনে নেয়।

একটানা ১৫ বছর ভোট না দিতে পারার জ্বালা ভোটপ্রিয় বাঙালির পক্ষে আর কত দিন সহ্য করা সম্ভব, তা বলা মুশকিল। রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা আগের নির্বাচনেই ধারণা দিয়েছিলেন, মানুষ ভোট দিতে না পারলে গণবিস্ফোরণ ঘটবে, যা হয়নি। গণপ্রতিবাদ বা প্রতিরোধের অভাবে নতুন কোনো কৌশলে সাংবিধানিকতার অজুহাতে মানুষকে ভোটবঞ্চিত করতে কেউ যে প্রলুব্ধ হবে না, তা দিব্যি দিয়ে বলা সম্ভব নয়। 

গণতান্ত্রিক বিশ্ব, বিশেষত পাশ্চাত্যের একটি দেশও ওই দুই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান ও জাতিসংঘের বিবৃতিগুলোর পুনরুল্লেখ করে নিবন্ধের পরিধি বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। আমাদের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুখ্যাত প্রতিবেশী ভারত এবং যাদের কাছে গণতন্ত্র মূল্যহীন, সেই চীন ও রাশিয়ার স্বীকৃতির কল্যাণে সরকার আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতার ধাক্কা ধীরে ধীরে ঠিকই সামলে নিয়েছে। সেটা আরও বেশি সম্ভব হয়েছে দেশের ভেতরে বিরোধী দলগুলো পিছু হটায়। মামলা-হামলার চাপে নাকাল রাজপথের প্রধান বিরোধী দলসহ অন্য কোনো দলই মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটিকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের ভেতরে প্রতিরোধ না থাকলে গণতন্ত্রের বন্ধুরা কেন এবং কীভাবে সাহায্যে এগিয়ে আসবে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। 

নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় যা ঘটেছে, তাতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। কমিশন নিজেদের গ্রহণযোগ্য করার জন্য অনেক চেষ্টাই করছে, কিন্তু ইভিএম চাপিয়ে দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির প্রমাণ তারা ইতিমধ্যেই দিয়েছে। বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক কিংবা জাতীয় সরকারের মতো অন্তর্বর্তী কোনো ব্যবস্থার বিষয়ে সমঝোতা ছাড়া আগের মতো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ফাঁদে বিএনপি আবারও পা দেবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর শুধু তারাই দিতে পারে। কেননা, ২০১৮–তে ফলাফল প্রত্যাখ্যানের পরও আপাতদৃশ্যে কোনো রাজনৈতিক লাভ ছাড়াই হাতে গোনা পাঁচজনকে সংসদে পাঠিয়ে দলটি বিস্ময়করভাবে সরকারকে প্রয়োজনীয় বৈধতা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের কৌশলগুলো
সময়মতো বুঝতে ও তা মোকাবিলায় উপযুক্ত কর্মসূচি ও পদক্ষেপ নেওয়ার সামর্থ্যের কোনো প্রমাণ দলটি এখনো দিতে পারেনি। কথাটি যেমন নির্বাচনের বেলায় প্রযোজ্য, তেমনি আন্দোলনের বেলাতেও। 

শুধু ভোটই গণতন্ত্র নয় বলে কেউ কেউ সুষ্ঠু ও মানসম্মত নির্বাচনের আবশ্যকতাকে নাকচ করার চেষ্টা করে থাকেন। তাঁরা সম্ভবত সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাটি কখনো পড়েননি, যার ২১ নম্বর ধারার ৩ উপধারা বলছে: জনগণের ইচ্ছাই হবে সরকারের শাসনক্ষমতার ভিত্তি; এই ইচ্ছা নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত প্রকৃত নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যক্ত হবে; গোপন ব্যালট কিংবা সমপর্যায়ের কোনো অবাধ ভোটদান পদ্ধতিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৪ বছর পেরিয়েছে, আর এক বছর পর একটা ‘প্রকৃত নির্বাচন’ নিশ্চিত করতে না পারলে তা হবে আমাদের রাজনীতির চূড়ান্ত ব্যর্থতা, যা এক অর্থে রাষ্ট্রেরও ব্যর্থতা।

লেখক: সাংবাদিক