রেল থেকে এক মাসের বেতন পাওয়া হয়ে গেলে তিনি বললেন, ‘অনেক হয়েছে। এবার আসো।’ আমিও বাধ্য ছেলের মতো এসে আবার ভোরের কাগজ–এর টেবিলে বসে পড়লাম।

আরেকবার আমেরিকার ব্রাউন ইউনিভার্সিটি আমাকে রাইটার ইন রেসিডেন্সের পদ দিয়ে দিল। বাংলাদেশে লেখকের স্বাধীনতা কম। তারা বলল, ‘এটা হবে তোমার জন্য সেফ হ্যাভেন।’

তারা রুম দিল, বড় অ্যাপল কম্পিউটার দিল, ফোন দিল, মাস শেষে বেতন পাব, ট্যাক্স দিতে হবে না। আমার কাজ হলো লেখা। বাংলায় লেখা। এমনকি না লেখা। আমি তাদের সঙ্গে আছি, এ–ই তাদের আনন্দ। লেখার স্বাধীনতা বলতে যা বোঝায়।

প্রথম আলোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন আসা বন্ধ হয়ে গেল। আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ল প্রতিষ্ঠানটি। লতিফুর রহমান সাহেব বললেন, ‘আপনারা এত দিন লাভ করেছেন। এবার লোকসান করবেন। ব্যবসায় এটা হয়ই। কিন্তু নীতি–আদর্শ থেকে একচুল নড়বেন না।’

আবার এক মাস। মতি ভাই বললেন, ‘এবার চলে এসো।’ আমি তো বাধ্য ছেলেই। সুড়সুড় করে চলে এলাম। ব্রাউনকে বললাম, ‘এই সুযোগ তোমরা আর কাউকে দাও। আমাকে দেশের মানুষের মধ্যে থাকতে হবে। নাহলে কিছুই লেখা হবে না।’

এখন প্রথম আলোতে আমরা যাঁরা আছি, তাঁরা কেন আছি, এই প্রশ্নের কতগুলো উত্তর দিই:

এক. প্রথম আলো ১৯৯৮ সালে আত্মপ্রকাশই করেছিল একটা ভীষণ অপরিবর্তনযোগ্য অঙ্গীকার করে। আমরা বাংলাদেশের উন্নতিতে অবদান রাখব। তা করব স্বাধীন সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্র দেশের এবং দেশের মানুষের বহু উপকার করতে পারে।

আমাদের সম্পাদক মাঝেমধ্যে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় আমাদের দু–চারজনকে সঙ্গে নিয়ে বসেন। কোনো কোনো দিন তাঁর মনের গোপন দরজার কবাট খুলে যায়। তিনি বলতে থাকেন, ‘দেখো আনিস, দেখেন সাজ্জাদ, শোনেন সুমনা, শাবানা আজমির বাবা কাইফি আজমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। তাঁদের বিয়েটা হলো কীভাবে শুনবেন...এই গল্প চলবে আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা। হাতের খাবার শুকিয়ে কাঠ। গল্পের শেষটা হলো: ভালো কিছু করতে হলে একটা বৃহত্তর আদর্শবোধ থাকতে হয়। মানুষের জন্য আমরা একটা কিছু করব, সেই তাড়নাটা ভেতরে থাকতে হয়। আমরা কিন্তু প্রথম আলো করেছি মানুষের ভালোর জন্য। প্রথম আলোর ডিএনএতে এটা যেন ভবিষ্যতেও থাকে, সেটা কিন্তু আপনারা নিশ্চিত করবেন।’

প্রথম আলো ছাড়া যায় না। প্রথম আলোর আরেক নাম মায়া। 

দুই. আমাদের প্রকাশনা সংস্থার বিনিয়োগকারীরা, উদ্যোক্তারা আমাদের জন্য এক পরম আশীর্বাদ। তাঁরা আমাদের ওপরে বটগাছের ছায়া আর দূর নক্ষত্রের আলো। মিডিয়াস্টার লিমিটেডের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান কোনো দিনও জানতে চাননি প্রথম আলোয় কী ছাপা হয়। তাঁদের ওপরে আঘাত এসেছে, তবু তাঁরা বলে গেছেন, আপনারা আপনাদের স্বাধীন, সৎ সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখুন। তাঁর অবর্তমানে বর্তমান বোর্ডও সেই মূল্যবোধ ও নীতি অব্যাহত রেখেছেন।

প্রথম আলোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন আসা বন্ধ হয়ে গেল। আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ল প্রতিষ্ঠানটি। লতিফুর রহমান সাহেব বললেন, ‘আপনারা এত দিন লাভ করেছেন। এবার লোকসান করবেন। ব্যবসায় এটা হয়ই। কিন্তু নীতি–আদর্শ থেকে একচুল নড়বেন না।’

করোনায় সব অনিশ্চিত। একবার ভাবা হলো, কর্মীরা কিছু পরিমাণ করে বেতন কম নেবেন। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট বললেন, তা হবে না। কর্মীদের বেতন কমানো যাবে না।

এখন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ ইনক্রিমেন্ট যোগ হচ্ছে আমাদের বেতনের শেষে।

তিন. প্রথম আলোর পরিবেশ। আপনারা দেখবেন, সব নরমসরম ভালো মানুষের সমাবেশ এই প্রতিষ্ঠানটা। নরম কিন্তু নীতির প্রশ্নে নাছোড়। সোহরাব হাসান কিংবা আব্দুল কাইয়ুমের মতো ভালো মানুষ আমরা আর কোথায় পাব? সাজ্জাদ ভাইয়ের সামনে গেলে দুটো জ্ঞানের কথা শুনি। সুমনা শারমীন কিংবা উৎপল শুভ্র হাসাতে থাকেন। তরুণতম জিনাত কিংবা বিপাশার কাছে গেলে শুনতে পাই, কেমন করে তাঁরা দূর থেকে প্রথম আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতেন, কোনো দিন কি এই প্রতিষ্ঠানের লোকদের সঙ্গে দেখা করতে পারব—এই ছিল তাঁদের মনের গোপন আশা। কিন্তু তাঁরা সাংঘাতিক সব নতুন তথ্য আর উদ্যম যোগ করেন প্রথম আলোর ধমনিতে।

আপনি প্রথম আলো ভবনে বেড়াতে আসবেন। দেখবেন, এর ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনটাও কত সুন্দর। খোলামেলা, কিন্তু আধুনিক। আমরা খোলা জানালা দিয়ে রেলগাড়ির আসা–যাওয়া দেখি। প্রথম আলো করোনাকালে তার কর্মীদের চিকিৎসার জন্য ব্যয় করেছে এক কোটির মতো টাকা। আমার মতো পুরোনো কর্মীরা প্রতিষ্ঠান থেকে ৪ নম্বর গাড়িটা পেল। আগের তিনটা গাড়ি কিন্তু আমাদের নামেই লিখে দেওয়া হয়েছিল।

আমি যেদিন ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে দিয়ে আসি, আম্মা রংপুর থেকে ফোন করেছিলেন। বললেন, ‘সরকারি চাকরি কেউ ছাড়ে?’

আমি বললাম, ‘সরকারি চাকরিতে তো বেতন কম।’

আম্মা বললেন, ‘কিন্তু অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে।’

আমি বললাম, ‘আম্মা, আপনি পরহেজগার মানুষ, এটা কী বলছেন?’

আম্মা বললেন, ‘না না, আমি আদার ফ্যাসিলিটিজের কথা বলছি। অন্য কিছু না।’

‘অন্য কিছু না’ করে ভালোই তো আছি। রাতের বেলা ঘুম ভালো হয়। সকালবেলা কাগজ পড়ি। বিদ্যুৎ খাতের বিপর্যয় ভুল নীতির কারণে অনিবার্য ছিল—মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সাক্ষাৎকার পড়ে মনটা দমে যায়। আবার ট্রাস্টের অদম্য মেধাবী বৃত্তিপ্রাপ্তরা যখন চিকিৎসক কিংবা কর্মকর্তা হয়ে মিষ্টি নিয়ে অফিসে আসেন, সব হতাশা ঝেড়ে কাজ শুরু করি। মাদকবিরোধী পরামর্শ সভায় এসে বুয়েটের ছাত্র উপকৃত হলে তাঁর মা দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ, প্রথম আলো যেন বেহেশতবাসী হয়’। আমরা আবেগে চোখ মুছি।

২৪ বছর আগে মতি ভাইকে বলেছিলাম, অবসর নেওয়ার সময় যেন বলতে পারি, জীবনটা অর্থহীন কাজে অপচয় করে ফেলিনি। সরকারি চাকরি করলে আর দুই বছর পরে অবসরেই যেতাম। তখন কী মনে হতো জানি না। এখন মনে হচ্ছে, মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের গরুর গাড়ির ছবিটা খেয়াল করুন। গরু চেষ্টা করছে, গাড়িয়ালেরা চাকা ঠেলছে। আমি যদি ওই কাদায় এক টুকরা ঢিল রাখতে পারি, চাকাটা হয়তো ঘুরবে, গাড়িটা উঠে যাবে। আমরা দেশের চালক নই, ইঞ্জিন নই, কিন্তু আমরা দেশের চলাটাকে একটু বেগবান করার ক্ষেত্রে ভূমিকা তো রাখছি। ১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন বলেছিলেন, সরকারবিহীন সংবাদপত্র আর সংবাদপত্রবিহীন সরকারের মধ্যে তিনি প্রথমটা, মানে সংবাদপত্রকেই বেছে নেবেন।

আমরাও তা–ই করছি। দেশের অগ্রগতির জন্য কাজ করছি। গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করছি। গণতন্ত্রকে সত্যিকার গণতন্ত্র করে তুলে দেশের মানুষের ভাগ্যের বদল ঘটানোর জন্য কাজ করছি। সেই কাজে আনন্দ আছে। তৃপ্তি আছে। কষ্ট, সংগ্রাম, ব্যর্থতা আছে। মামলা-মোকদ্দমা আছে। কিন্তু তা কার জীবনে নেই? ফুল থাকলে কাঁটা তো কিছু থাকবেই।

প্রথম আলোর শিকড়টা ‘মানুষের কল্যাণ’ নামের একটা মহত্তর উদ্দেশ্যের মাটিতে গভীরভাবে পোঁতা। আপনিও প্রথম আলোয় এলে তার ঘোরে পড়ে যাবেন। আর ছাড়তে পারবেন না। যাঁরা প্রথম আলো ছেড়ে গেছেন, তাঁরাও আসলে এখনো প্রথম আলোর ছায়া আর মায়ার বিভ্রমেই আছেন। আমরা তাঁদেরও ছাড়িনি, তাঁরাও আমাদের ছাড়েননি।

প্রথম আলো ছাড়া যায় না। প্রথম আলোর আরেক নাম মায়া। 

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো