আমি কাজ করতে বাইরে যেতাম। ঢাকায় রিকশা চালাতে, চট্টগ্রামে জাহাজের লোহা কাটতে, নোয়াখালী-বগুড়া-টাঙ্গাইলে ধান কাটতে। তা ছাড়া একেবারে অজপাড়াগাঁ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিলাম। তাই হয়তো মানুষজন আমাকে চিনত।

উপজেলা মেডিকেলে বলে দিল, এ রোগী রংপুরে নিয়ে যেতে হবে। অগত্যা সিদ্ধান্ত হলো, ঠাকুরদাদাকে বাড়িতে ফেরত নিয়ে যাওয়া হবে। আমি ভাবলাম, এসেছি যখন, অন্তত একজন এমবিবিএস ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে যাই।

উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করাতে যে ১০ টাকার টিকিট লাগবে, সেটাই আমার কাছে নেই। ডাক্তারকে তো ৫০ টাকা দিতে হবে। তার ওপর ওষুধ। একটাই ভরসা, ডোমারে ডাক্তার নিহাররঞ্জন আমাকে একটু একটু চেনেন।

ঠাকুরদাদাকে নাড়িয়ে–চাড়িয়ে দেখে ডাক্তার আমাকে খুব বকা দিলেন, ‘মানুষটা মরার পরে নিয়ে এসেছিস?’ এরপর প্রেসক্রিপশন লিখে বললেন, ‘তোর দাদার জন্য টাকা দিতে হবে না। যা।’

বেরিয়ে এসে সবাইকে বললাম, ‘তোমরা ঠাকুরদাদাকে বাড়িতে নিয়ে যাও। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।’

শূন্য পকেট। একটা ফার্মেসিতে গিয়ে প্রেসক্রিপশনটা এগিয়ে দিয়ে আমতা-আমতা করে জানতে চাইলাম, এক দিনের ওষুধের জন্য কত টাকা লাগবে। ওরা বলল, বড়িজাতীয় ওষুধগুলো এক দিনের জন্য দেওয়া যাবে, কিন্তু সিরাপ আর স্যালাইন তো পুরোটাই নিতে হবে। তাই খরচটা আজ বেশিই হবে। ক্যালকুলেটর টিপে বলল, সাত শর মতো পড়বে। আমি অনুনয় করে বললাম, ওষুধগুলো খুব জরুরি। দাদার এখন-তখন অবস্থা। বাকিতে দিলে দুই দিন পরে এসে আমি টাকা দিয়ে দেব।

তারা রাজি হলো না। লজ্জায় হাহাকার করে উঠল ভেতরটা! নিজেকে যে কী তুচ্ছ মনে হতে লাগল! ডোমারের হকার আংকেল সে সময় কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে সাইকেল থামিয়ে বললেন, ‘এত দিন কোথায় ছিলে? পেপার নিচ্ছ না যে?’ স্কুলে থাকতে মাঝেমধ্যে আমি পত্রিকা কিনে পড়তাম। বললাম, ‘আজ টাকা নেই।’ সে দিন বোধ হয় তাঁর কাটতি হয়নি। জোর করে আমার হাতে পত্রিকা গুঁজে দিয়ে তিনি চলে গেলেন। প্রথম আলো না দিয়ে অন্য পত্রিকা দিয়েছেন। বিরক্তিতে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই দেখি তিনি নেই।

বিরক্তি নিয়েই পত্রিকা খুললাম। ও মা, সেখানে লেখা, ‘ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক শিক্ষাবৃত্তির ফলাফল ভেতরের পাতায়’। আমি আবেদন করেছিলাম। ভাইভাও দিয়েছি। আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। পাতা উল্টে দেখি তালিকায় আমারও নাম। শরীর কাঁপিয়ে আমার কান্না চলে এল। ফার্মেসির ছেলেগুলো ছুটে এল। পত্রিকা দেখে তারাও বিস্মিত। এবার তারা বাকিতে সব ওষুধ দিয়ে রসিদ লিখে বলল, ‘দুই দিন পরে এসে দিয়ে দিয়েন।’

বাড়ির পথে এবার আমার রাস্তা ফুরাচ্ছেই না। মা-বাবার কাছে গিয়ে যে কখন যে চিৎকার করে বলব, ‘দ্যাখো, আমি বৃত্তি পেয়েছি!’ ঠাকুরদাদাকে কখন গিয়ে বলব, ‘দাদা, তোমার জন্য ওষুধ এনেছি!’ বাড়িতে সত্যি সত্যি আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল।

ছয় দিন পর শিক্ষাবৃত্তির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমি ঢাকায় গেলাম। আগের সারা রাত দাদার সঙ্গে কত যে কথা! ঢাকার শ্যামলীতে এক আত্মীয়ের বাসায় বিকেলে পৌঁছে জানতে পারলাম, আমি চলে আসার কিছুক্ষণ পরই ঠাকুরদাদা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।