এই সবকিছুর সূচনা করেছিলেন আমীরুল ইসলাম নামের এক কিশোর। আন্তস্কুল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। জেলায় সেরা সাঁতারুও হয়েছিলেন। কিন্তু বিভাগীয় পর্যায়ে গিয়ে ছিটকে পড়েন। 

সেই যে সাঁতারে সেরা না হতে না পারার আক্ষেপ, বড় হয়েও তা পুষে রেখেছিলেন আমীরুল ইসলাম। পড়াশোনা শেষ করে নওদা আজমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্রীড়াশিক্ষক হন তিনি। ক্লাস নেন আর ভাবেন, এবার কাজে নামার সময় হয়েছে। এলাকার ছেলেমেয়েদের সাঁতার শেখাতে উদ্যোগী হলেন। সময়টা ১৯৮৪ সাল। শুরুতে পেলেন ১০ কি ১২ জন ছেলে। খালে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলেন। ফল পেতেও বেশি দিন লাগল না। ১৯৯১ সালে জাতীয় পর্যায়ে সোনা জয় করল তার দলের রমজান আলী ও মনিরুল ইসলাম। গ্রামবাসীরও উৎসাহ বেড়ে গেল, বাড়ল সাঁতারে আগ্রহী তরুণের সংখ্যা। একে একে আমিরুলের হাতে তৈরি হলেন মমতাজ শিরীন, সবুরা খাতুন, রুবেল রানা, রুবেল আহমেদ, জুয়েল আহমেদের মতো জাতীয় পর্যায়ে সোনাজয়ী সাঁতারু।

ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত নবম সাফ গেমসে আমলার সাঁতারু রুবেল রানা স্বর্ণপদক লাভ করেন। ২০০৯ সালে জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় আমলার সাঁতারুরা বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে খেলে মোট ১৪টি জাতীয় রেকর্ডের মধ্যে ১৩টি রেকর্ড গড়েন। আর ৪৭টি সোনা, ৪০টি রুপা ও ২৭টি ব্রোঞ্জপদক পান। ২টি নতুন জাতীয় রেকর্ডসহ ১১টি স্বর্ণপদক পেয়ে বাংলাদেশ মহিলা সাঁতারুদের মধ্যে সেরা নির্বাচিত হন আমলার ববিতা খাতুন। আমলার আরেক সাঁতারু জুয়েল রানা ৪টি নতুন জাতীয় রেকর্ডসহ ৯টি স্বর্ণপদক পেয়ে সারা দেশের পুরুষদের ইভেন্টে সেরা সাঁতারু নির্বাচিত হন। ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন রেকর্ডসহ এখানকার সাঁতারুরা অর্জন করেন ৫০টি স্বর্ণপদক। এখনো অব্যাহত সেই ধারাবাহিকতা।

আমলায় পাঁচ ক্লাব

আমীরুল ইসলামের হাতেই ১৯৮৬ সালে গড়ে ওঠে আমলা সুইমিং ক্লাব। সাফল্য বাড়তে থাকলে গড়ে ওঠে আরও চারটি ক্লাব: সাগরখালী, লালন শাহ, গড়াই ও মেহেরপুর সুইমিং ক্লাব। প্রায় ২০০ সাঁতারু এসব ক্লাবে প্রশিক্ষণ নেন, যাঁর ৬০ জন নারী। এই পাঁচটি ক্লাবই বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের অনুমোদন পেয়েছে। প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপি। ক্লাবগুলোর সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষক কামাল হোসেন, মর্জিনা খাতুন, এমদাদুল হক ও আনোয়ার হোসেন। আর তাঁদের মাথার ওপরে ছায়ার মতো আছেন আমীরুল ইসলাম। ক্লাবের পাশাপাশি কুষ্টিয়া স্টেডিয়ামের পাশে তৈরি হয়েছে আধুনিক সুইমিংপুল। সেখানেও সাঁতার প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার আয়োজনে থাকে আমলার ছেলেমেয়েরা। 

সাঁতারে কৃতিত্ব দেখিয়ে আমলা থেকে সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়েছেন ৪২ জন, আনসার-ভিডিপিতে ১৯ জন, নৌবাহিনীতে ১৫ জন, বিমানবাহিনীতে ৩ জন। সাঁতারকে কেন্দ্র করে একটি উপজেলার একটি ইউনিয়ন থেকে এতজনের চাকরি পাওয়ার ঘটনা বিরল। পড়াশোনা শেষে অনেকেই যেখানে বেকার ঘুরে বেড়ান, সেখানে সাঁতারে পারদর্শী হলে দ্রুত চাকরিও মিলছে। আমলার অনেক অভিভাবকই তাই সন্তানদের তুলে দিচ্ছেন সাঁতার প্রশিক্ষকদের হাতে। তাই আমলার তরুণেরাও সাঁতারে আগ্রহী হচ্ছে।

আমীরুল ইসলাম বর্তমানে বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপির সাঁতার দলের কোচ। বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। বলছিলেন, ‘সাঁতার দেশের মানুষের কাছে আমলাকে চিনিয়েছে। দেশের সেরা সাঁতারুদের অর্ধেকের বেশি আমলা থেকেই তৈরি হয়। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে।’

লেখক: প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া