হকিও একসময় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ হকি দেশব্যাপী জাগরণ সৃষ্টি করে। একটুখানি খোলা চত্বর পেলেই গাছের ডাল বা লাঠিসোঁটা নিয়ে হকি খেলতে দেখা যায়। সেই উন্মাদনা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিরিখে কাবাডিকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ জাতীয় খেলাটির অবস্থান ক্রমে নিম্নমুখী। এশিয়ান গেমসের শুরুতে রৌপ্যপদক জিতলেও হালে কোনো পদক পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিকভাবে কাবাডি খেলার পরিসর যত বাড়ছে, ততই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। 

জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বিশ্বব্যাপী দলগত খেলাগুলো এগিয়ে। খেলার প্রতিটি মুহূর্তে জড়িয়ে থাকে উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা, উদ্দীপনা। এ দেশেও দলীয় খেলাগুলো বেশি জনপ্রিয়। বাস্তবতা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দলগত খেলায় বাংলাদেশ একদমই সুবিধা করতে পারছে না। এই না পারার পেছনে অন্তর্নিহিত অনেক কারণ রয়েছে। বংশগতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা, দৈহিক গড়নের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টিকর খাবার, আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণের সুযোগ, কোচিং, অর্থায়ন ইত্যাদি ফারাক গড়ে দেয়। এ দেশের মানুষ যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তাতে শারীরিক স্ট্যামিনা ও ফিটনেসের দিক দিয়ে যথেষ্ট খামতি রয়ে যায়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ ও উদ্যমহীনতা তো আছেই। 

ক্রিকেট দলগত খেলা হলেও এর মেজাজ ভিন্ন প্রকৃতির। মানচিত্রও খুব বেশি বিস্তৃত নয়। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ক্রিকেটে সমর্থনের জোয়ার আসে। ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয় করলেও বড় আসরে গৌরব করার মতো শিরোপা অর্জন করা এখনো সম্ভব হয়নি। তা যে অসম্ভব নয়, এই বিশ্বাসটুকু ক্রিকেটাররা অন্তত দিতে পেরেছেন। তবে বারবারই ছন্দ কেটে যায়। 

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের তুলনমূলক বড় সাফল্যগুলো আসে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের খেলায়। এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত একমাত্র ব্রোঞ্জপদকটি পাওয়া যায় বক্সার মোশারফ হোসেনের কৃতিত্বে। ফুটবল, ক্রিকেটের অঙ্গুলিমেয় পদক বাদ দিলে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ক্রীড়ায় বেশির ভাগ স্বর্ণপদক এসেছে একক ইভেন্টগুলোতে।

নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় সাঁতার নিয়ে প্রবল আশাবাদ থাকলেও বাস্তবে প্রতিযোগিতামূলক গেমসে এখন আর কুলিয়ে উঠতে পারছেন না সাঁতারুরা। তারপরও পদকের পাল্লায় সাঁতারুদের অবদান রয়েছে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করা দুই দাবাড়ু গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ আর ব্রিটিশ নারী দাবায় চ্যাম্পিয়ন রানী হামিদ। নিয়াজের পথ অনুসরণ করে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়েছেন জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার, আবদুল্লাহ আল রাকিব ও এনামুল হোসেন। যদিও অনেক দিন ধরে আর কোনো গ্র্যান্ডমাস্টারের দেখা
মিলছে না। 

বিদেশের মাটিতে লাল-সবুজ পতাকা সগৌরবে উড়িয়ে যাচ্ছেন শুটাররা। ১৯৯০ সালে কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণপদক জয় করেন আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনি। যদিও আসিফ হোসেন খানের পর আর স্বর্ণপদক না এলেও প্রতিটি গেমসেই অন্তত পদক মিলছে। অবশ্য সর্বশেষ এসএ গেমসে স্বর্ণপদক জয় করতে না পারা অশনিসংকেত। গলফের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিনিয়েছেন সিদ্দিকুর রহমান। পেশাদার গলফে অংশ নিয়ে সাফল্য পাওয়ার পর ব্রুনেই ওপেনে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জয় করেন
এশিয়ান ট্যুর প্রফেশনাল গলফ টুর্নামেন্ট। তবে সিদ্দিকুরকে অনুসরণ করে নতুন কারও উঠে আসার প্রতীক্ষা দীর্ঘতর হচ্ছে। 

সাম্প্রতিক কালে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে আশা-ভরসা হয়ে উঠেছে আর্চারি। আর্চাররা নিয়মিতভাবে সাফল্য পাচ্ছেন। নেদারল্যান্ডসে বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে রিকার্ভ ইভেন্টে রোমান সানার ব্রোঞ্জ এবং সুইজারল্যান্ডে বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে স্টেজ-২–এর মিশ্র ইভেন্টে রোমান সানা আর দিয়া সিদ্দিকীর রৌপ্যপদক জয় বেশ বড় ঘটনাই। সব মিলিয়ে পদক জয়ের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। 

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন কত দূর যাবে, তার প্রক্রিয়া কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত সবার আগে নেওয়া প্রয়োজন। সমস্যা হচ্ছে, ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্যের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা নেই। হঠাৎ সাফল্যের আলো ঝকমকিয়ে দিলেও তারপর দেখা মেলে নিষ্ফলা লম্বা সময়ের। আসলে সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখা অনেকটা রিলে রেসের মতো। দৌড়ে কেউ এগিয়ে গেলেও সঙ্গীরা তাল মেলাতে না পারলে পিছিয়ে পড়তে হয়। পারম্পর্য নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য যে পাইপলাইন থাকতে হয়, সে ক্ষেত্রে সংগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। 

অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এতটা সমৃদ্ধ নয় যে ক্রীড়াঙ্গনে অঢেল অর্থের জোগান পাওয়া যাবে। অথচ জাতীয়ভাবে প্রচলিত আছে অর্ধশতাধিক খেলা। গয়রহভাবে সব খেলার পৃষ্ঠপোষকতা করা কতটা বাস্তবসম্মত? সে ক্ষেত্রে যে খেলাগুলোতে সম্ভাবনা আছে, আছে জনপ্রিয়তা, তাতে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। জাতীয় ক্রীড়ানীতিতে সম্ভাবনাময় খেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে যথাযথভাবে পরিচর্যা করা হলে তার সুফল পাওয়া যাবে। দৃষ্টান্ত, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রধান উৎস এখন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)। 

উদ্যম, চেষ্টা ও সাধনা দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। সে জন্য খেলোয়াড়, সংগঠক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অন্তর্গত একটা তাগিদ থাকতে হয়। সেটা থাকলে সব হিসাব পাল্টে দেওয়া অসম্ভব নয়। তার অনন্য নজির নারী ফুটবলাররা। সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে বসবাসকারী নারীরা ক্ষুধা, অশিক্ষা আর সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে যেভাবে সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন, তা কি আমাদের দিব্যদৃষ্টি খুলে দেয়নি? 

এই মেয়েদের অজপাড়াগাঁ থেকে তুলে এনে দীর্ঘদিন একই ছাউনির নিচে, একসঙ্গে নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে গাঁথা হয়েছে একসুতোয় মালা, তার সৌরভে সুরভিত এখন চারপাশ। এই সৌরভ ক্রীড়াঙ্গনের সর্বত্রই ছড়িয়ে দেওয়া কি অসম্ভব? 

লেখক: ক্রীড়াজগত–এর সম্পাদক