গত ৩১ অক্টোবর প্রথম আলোর সম্পাদক, সাংবাদিক ও বিপণন বিভাগের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদপত্র এজেন্ট ও হকারদের জুম (অনলাইন) আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। প্রথম আলোর ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষে এই অনলাইন বৈঠকের আয়োজন করা হয়। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এজেন্ট ও হকারদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় অংশ নিয়ে তাঁদের সমস্যা ও সংকটগুলো শোনেন, পরামর্শ দেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি ও বিপণন ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন রওনক।

বৈঠকে দেশের ছয়টি অঞ্চলের ১২ জন সংবাদপত্র এজেন্ট ও হকার অংশ নেন। তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙামাটির এজেন্ট বাসনা দাশ ও চট্টগ্রামের হকার আনোয়ার হোসেন। সিলেটের এজেন্ট সিকন্দর আলী ও হকার আবদুল কুদ্দুস। বগুড়ার এজেন্ট আব্দুর রফিক ও হকার লুতফর রহমান। রংপুরের এজেন্ট মিজানুর রহমান ও হকার সফিকুল ইসলাম। ময়মনসিংহের এজেন্ট কবিরুল ইসলাম ও হকার তারা মিয়া এবং ঢাকার হকার রবিউল ও মো. হারুন।

আলোচনার সূচনা করে মহিউদ্দিন রওনক বলেন, ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদপত্র এজেন্ট ও হকারদের নিয়ে সম্পাদকের সঙ্গে এবারই প্রথমবারের মতো এ ধরনের আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান আলোচনায় অংশগ্রহণকারী এজেন্ট, হকারসহ দেশের সব এজেন্ট ও হকারকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, ‘এ বছর আমরা ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করছি। আমাদের সব আয়োজনের মূল লক্ষ্য আরও বেশি করে পাঠকের কাছে যাওয়া। তাঁদের পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত করা। এ কাজে এজেন্ট-হকারদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আগামী বছর আমরা ২৫ বছর পূর্ণ করব। তখন আরও বড় আয়োজনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।’

প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘করোনা অতিমারি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি—এসব নিয়ে সারা পৃথিবীর অবস্থাই ভালো নয়। আমাদের দেশের অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে খবর পড়তে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে ছাপা কাগজকে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া সহজ নয়।

তবে আশার কথা, মানুষ এখনো সারা দিন ডিজিটাল মাধ্যমে যে সংবাদগুলো পান, তার সত্যতা নিশ্চিত হতে পরদিন সকালে ছাপা কাগজেই চোখ রাখেন। পাঠকের এই আস্থাই ছাপা কাগজের প্রধান শক্তি। সেই শক্তির জোরেই ছাপা কাগজ সংকট অতিক্রম করে টিকে থাকবে। তবে এ জন্য সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে ও গুণগত মান উন্নত করে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করতে হবে। প্রথম আলো তার যাত্রার শুরু থেকেই এ বিষয়ে কোনো আপস করেনি। ভবিষ্যতেও এই ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।’

গ্রাহক কমে যাওয়ায় এজেন্ট-হকারদের আয় কমে যাওয়া প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, আয় বাড়ানোর জন্য বিকল্প চেষ্টাও করতে হবে। প্রথম আলো পত্রিকার পাশাপাশি সাময়িকী যেমন কিশোর আলো, বিজ্ঞানচিন্তা, প্রতিচিন্তা, চলতি ঘটনা—এসব বিক্রি করতে পারেন। তা ছাড়া প্রথমা প্রকাশনের বইয়ের বেশ ভালো পাঠক রয়েছে। বই বিক্রির চেষ্টা করতে পারেন। সবাই মিলেই এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে রাঙামাটির বাসনা দাশ বলেন, ১৫ বছর ধরে তাঁদের এই ব্যবসা। তাঁর স্বামী বিকাশ দাশ ছিলেন এজেন্ট। দুই বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিনিই ব্যবসা চালাচ্ছেন। সবার সহযোগিতায় বেশ ভালো চলছে। চট্টগ্রামের হকার আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রথম আলো তাঁদের আবেগ ও ভালোবাসার পত্রিকা। করোনাকালে পাশে থাকার জন্য প্রথম আলোকে তিনি ধন্যবাদ জানান।

সিলেটের এজেন্ট সিকন্দর আলী বলেন, করোনার সময় সিলেটে টানা দুই মাস কোনো কাগজ ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। এতে একদিকে পাঠক যেমন পত্রিকাবিমুখ হয়েছেন, তেমনি সংসার চালাতে গিয়ে হকারদের অনেকে অন্য পেশায় চলে গেছেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি সিলেট শহরের বিভিন্ন অনিয়ম, সমস্যা, দুনীতি নিয়ে প্রকাশিত সংবাদগুলো পাঠকের মধ্যে আলোচিত হয়েছে।

এ ধরনের সংবাদ বেশি বেশি প্রকাশিত হলে পত্রিকা পড়তে পাঠকের আগ্রহ বাড়বে। এই সংকটের সময় কোনো পত্রিকার প্রচারসংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলে সেটি হলো প্রথম আলো। অন্য পত্রিকাগুলো প্রচারসংখ্যা ধরে রাখতে পারছে না। তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘পাঠক ধরে রাখতে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। পাঠকের লেখা ছাপছি। তাঁদের পুরস্কার দেওয়া হবে। আমরা প্রথম আলোকে পারিবারিক পত্রিকা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’

হকার আবদুল কুদ্দুস বলেন, শুধু সংবাদপত্র বিক্রি করে এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে প্রথম আলোর গ্রাহকেরা আবার ফিরে আসছেন। এটা তাঁকে সাহস দিচ্ছে।

বগুড়ার এজেন্ট আবদুর রফিক বলেন, প্রথম আলো সব সময় সাহসী ভূমিকা রেখে চলেছে। সরকারের নানা অনিয়ম, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরছে। প্রথম আলোকে এই জায়গাটা ধরে রাখতে হবে। প্রবীণ হকার লুতফর রহমান বলেন, প্রথম আলোর চাহিদা আছে। তবে এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সময় খবরের কাগজের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ইচ্ছা থাকলেও অনেকে পত্রিকা নিচ্ছেন না।

সম্পাদক এ বিষয়ে বলেন, ‘কাগজের দাম অনেক বেড়েছে। এখন একটি পত্রিকা ছাপতে ২৪ টাকা খরচ হয়। আমরা পাই ৮ টাকার মতো। ফলে বাধ্য হয়েই দাম বাড়াতে হয়েছে।’

রংপুরের এজেন্ট মিজানুর রহমান সম্পাদকের সঙ্গে এমন সরাসরি আলোচনার আয়োজন করার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এমন মতবিনিময় নিয়মিত করা হলে যোগাযোগ বাড়বে এবং কোনো সমস্যা হলে বা কোনো নতুন উদ্যোগ নিলে সে বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সহায়ক হবে।

হকার শফিকুল ইসলাম বলেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে পত্রিকা পড়ার আগ্রহ কম। বয়স্ক পাঠকেরাই মূলত পত্রিকা পড়েন। পত্রিকার প্রচারসংখ্যা বাড়াতে হলে তরুণ প্রজন্মের পাঠকদের আগ্রহী করতে হবে।

ময়মনসিংহের এজেন্ট কবিরুল ইসলামও একই বিষয়ে আলোচনা করেন, বয়স্ক পাঠক কমে গেলে সমস্যা হবে। তরুণ পাঠক তৈরি হচ্ছে খুব কম। তারা মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। হকার তারা মিয়া করোনাকালে সহায়তার জন্য প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানান।

ঢাকার হকার রবিউল বলেন, তিনি ২০ বছর ধরে রাজারবাগ এলাকায় নিজের দোকানে কাগজ বিক্রি করেন। এখনো পাঠকের কাছে প্রথম আলোর চাহিদাই বেশি। মো. হারুন বলেন, তিনি ২৯ বছর ধরে মোহাম্মদপুর এলাকায় কাগজের ব্যবসা করেন। একবার দুর্ঘটনাকবলিত হয়েছিলেন। প্রথম আলো তাঁর চিকিৎসা সহায়তাসহ নানা রকম সাহায্য করেছে। এ জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

সমাপনী বক্তব্যে মতিউর রহমান বলেন, ‘আপনারা প্রথম আলোর সাহসী ভূমিকার কথা বলেছেন। তরুণদের যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। আপনাদের সঙ্গে এমন আলোচনার কথা বলেছেন। চেষ্টা করব, সম্ভব হলে তিন বা চার মাস পরপর আপনাদের সঙ্গে এমন আলোচনার আয়োজন করার।’

প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি, সব সময় বলি প্রথম আলো তার প্রতিশ্রুতি পালন অব্যাহত রাখবে। রাজনীতি, দুর্নীতি, অনিয়মের সংবাদের পাশাপাশি মানুষের নতুন উদ্যোগ, ইতিবাচক ঘটনা, সম্ভাবনার দিকগুলোকেও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হবে। আমরা বিশ্বাস করি, তরুণ প্রজন্মই আমাদের ভবিষ্যৎ। নানা রকম উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা আরও ব্যাপকভাবে তাদের কাছে যাব। স্কুলে স্কুলে কুইজ প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান উৎসব এমন অনেক কর্মসূচি চলতে থাকবে।’

প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘শেষ বিচারে এজেন্ট ও হকার ছাড়া সংবাদপত্রের ব্যবসা সম্ভব নয়। তবে করোনার সংকট বুঝিয়ে দিয়েছে শুধু সংবাদপত্র বিক্রি করে আয়কে আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। নানা রকম সাময়িকী, বই, ডিজিটাল মাধ্যমে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য নিজেদের জন্য দুটি কর্তব্য স্থির করা হয়েছে, প্রথমটি হলো পত্রিকা আরও ভালো করা। দ্বিতীয়টি পাঠক বাড়ানো। নতুন পাঠক তৈরি করতে হবে। এ জন্য আমাদের তরুণদের কাছে যেতে হবে। ২০২৩ সালে এটাই আমাদের লক্ষ্য।