খেলায় তো অনেকবারই জিতেছেন। কিন্তু জীবনের খেলায় মনে হচ্ছিল এবার শাম্মী হেরেই যাবেন। তাঁকে ফোন করি। তিনি অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে শাম্মীর বিয়ে হয় ২০০৯ সালে। নানা শারীরিক জটিলতার কারণে একসময় চিকিৎসকের পরামর্শে খেলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন শাম্মী। খেলা ছাড়লেও স্বামী-সংসার নিয়ে বেশ কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু কে জানত তাঁর জীবনে নেমে আসবে এমন বিপর্যয়? ২০১৮ সালে ঝিনাইদহে শ্বশুরবাড়িতে ডাকাতের হাতে খুন হন সাইফুল। দুই শিশুসন্তান আবু হুরায়রা ও আবু হামজাকে নিয়ে অকূলপাথারে পড়েন শাম্মী।

সেনাবাহিনীর চাকুরে সাইফুলের পেনশনের জন্য শাম্মী যশোর সেনানিবাসের সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডে আবেদন করেন। স্বামীর পেনশনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করতে তাঁর কেটে যায় ১৫ মাস। তখন এমনো দিন গেছে, বাজার করার কোনো টাকা থাকত না শাম্মীর। রিকশাভাড়া থাকত না। পেনশনের কাগজপত্র জোগাড় করতে অফিসে অফিসে ঘুরতেন পায়ে হেঁটে। ছেলেদের এক ফোঁটা দুধ কেনার টাকা ছিল না। কিন্তু লজ্জায় কারও কাছে হাত পাততেন না শাম্মী। যশোর সেনানিবাসে সাইফুলকে দেওয়া সরকারি কোয়ার্টারের বরাদ্দ তত দিনে শেষ হওয়ার পথে। মাথা গোঁজার ঠাঁইটাও হারাতে হবে তাঁর।

বিভাগীয় প্রধান তারেক মাহমুদ ভাইকে বিষয়টি জানালাম। অতঃপর আমি শাম্মীকে নিয়ে প্রতিবেদনটি করি। সেই প্রতিবেদন ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর প্রথম আলোর খেলার পাতায় বক্স করে ছাপা হয়। তারেক ভাই সেটার শিরোনাম দেন, ‘কেউ শোনে না শাম্মীর কান্না’।

প্রতিবেদনটি প্রথম আলোতে ছাপা হওয়ার পর যেন জাদুমন্ত্র বলে বদলে গেল শাম্মীর জীবন। এই প্রতিবেদন পৌঁছে গেল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তরে। প্রধানমন্ত্রী শাম্মীর ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলেন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান পুরো বিষয়টি তদারকি করলেন।

এরপর ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এল কাঙ্ক্ষিত দিন। প্রধানমন্ত্রী শাম্মীকে ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট উপহার দেন। শুধু তা–ই নয়, তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় ২৫ লাখ টাকার একটি পারিবারিক সঞ্চয়পত্র। সচিবালয়ে শাম্মীর হাতে ২৫ লাখ টাকার চেক ও ফ্ল্যাটের চাবি তুলে দেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।

১৮ ফেব্রুয়ারি ছিল আমার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। দুপুরের পর থেকে একের পর এক ফোন পাচ্ছি। সহকর্মীরা ফোন করছেন। অন্যান্য পত্রিকা ও টেলিভিশনের সাংবাদিকেরা ফোন করছেন। আমি বাসায় বসেও দিব্যি দেখতে পাচ্ছি অসহায় এক খেলোয়াড়ের মুখে স্বর্গীয় সেই হাসি। দেখতে পাচ্ছি দুই অনাথ শিশু পেতে চলেছে নিশ্চিত আশ্রয়ের ঠিকানা।

আমার এই প্রতিবেদনটি ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসপিএ) গত বছরের বর্ষসেরা ফিচার প্রতিবেদন ক্যাটাগরিতে পুরস্কারের জন্য জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু বিচারকদের রায়ে এটি সেরার ক্যাটাগরিতে ছিল না। তবে বিএসপিএর ওই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে এসে বেশ কয়েকবার আমার প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।

সেদিন পুরস্কার জিতিনি বলে এতটুকু আফসোস নেই আমার। আমার লেখা প্রতিবেদন অসহায় এক খেলোয়াড়ের জীবন বদলে দিতে জাদুকরি ভূমিকা রাখল—প্রথম আলোর একজন কর্মী হিসেবে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কীই–বা হতে পারে!

বদিউজ্জামান, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, ক্রীড়া বিভাগ