সংবাদপত্রে বা টেলিভিশনে কাজের অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। তবে খানিকটা ধারণা ছিল। দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী গণমাধ্যম, বাঘা বাঘা প্রতিবেদক, চৌকস বার্তা সম্পাদক এবং ‘জাদুকর’ এক সম্পাদক—এমন জায়গায় কাজ করতে গিয়ে প্রথম প্রথম কেমন যেন ভয় লাগত। অবশ্য আমার সেই ভয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
শুরুর দিকে আমাকে নিয়মিত অ্যাসাইনমেন্ট করতে হতো, দিনে তিনটি অ্যাসাইনমেন্টও করেছি। অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে আমি পছন্দ করি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে কিছুদিনের জন্য প্রধান প্রতিবেদকের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল, তখনো অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করেছি। আমার ধারণা, আমার চেয়ে ভালোভাবে কেউ স্বাস্থ্য বিটের অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে পারে না। গত ১৬ বছরে শত শত অ্যাসাইনমেন্ট করতে বলা হয়েছে আমাকে। একটি অ্যাসাইনমেন্টও আমি ‘মিস’ করিনি।

স্বাস্থ্য বিটে গ্ল্যামার কম। তবে আছে বিজ্ঞান। এ জন্য জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধবিজ্ঞানের অনেক বিষয় আমাকে জানতে হয়েছে। অনেক জটিল ও কঠিন বিষয় জেনেবুঝে পাঠককে জানিয়েছি। এতে অনেকেই ভাবতেন বা এখনো ভাবেন যে আমি চিকিৎসক। চিকিৎসকদের অনেকেই আমার কাছে জানতে চান, আমার এমবিবিএস পাসের সাল কত। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান মহাসচিব ইহতেশামুল হক চৌধুরী একবার এক সভায় জানতে চেয়েছিলেন, আমি কোন মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলাম। আমার সহকর্মীদের মধ্যেও কারও কারও এমন ধারণা ছিল। একবার এক নারী সহকর্মী হন্তদন্ত হয়ে এসে আমাকে বললেন, ‘দাদা, ...।’ আমি শান্ত চিত্তে প্রসূতিচিকিৎসকের নাম ও মুঠোফোন নম্বর দিয়েছিলাম।

সাংবাদিকদের সম্মান অন্য রকম। ‘প্রথম আলো’র সম্মান আরও অন্য রকম। অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে গিয়ে, সেমিনারে উপস্থিত থেকে প্রতিদিন সেই সম্মান উপভোগ করি। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, সেরা বিজ্ঞানী বা গবেষক, শীর্ষ চিকিৎসকেরা ‘প্রথম আলো’র প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে এবং আমার অন্য সব সহকর্মীকেও যে মান্যতা দেখান, তা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে কি পাওয়া যেত! ‘মিডিয়া ইজ দ্য মেসেজ’—মার্শাল ম্যাকলুহানের এই আপ্তবাক্য বাংলাদেশে শুধুই ‘প্রথম আলো’র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এই ভালোর সঙ্গে, আলোর সঙ্গে আমার বসবাস ২৪ ঘণ্টার। আমি বেশ কয়েক বছর ধরেই বলে আসছি, আমি ২৪ ঘণ্টার সাংবাদিক। এটা আমি মানি। আর মানি বলেই, অনেক বিষয়েই আমি পেছনে পড়ে যাই। যেমন, প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া। এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই অভ্যাসের কারণে, প্রতিদিনের ‘প্রথম আলো’টাও আমার ঠিকমতো পড়ার সময় হয় না। জানতে পারি না, কোন পাতায় কী আছে। ঠিক একইভাবে জানতে পারি না ‘প্রথম আলো’র কোথায় কী হচ্ছে। মতি ভাই মিটিংয়ে বলেন, ‘আমাদের পত্রিকাটি কত বড় হয়েছে, কত শাখা–প্রশাখা হয়েছে, কত মানুষ যুক্ত হয়েছে। সবকিছু জেনে উঠতে পারি না। লজ্জা পাই।

লজ্জা নেই আমার ফ্লোরে। আমার ফ্লোরটা ‘প্রথম আলো’র প্রাণকেন্দ্র। এক দিন আসতে না পারলে কেমন যেন বন্ধুবিচ্ছেদের ব্যথা জাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের নিয়ে খেয়ে না খেয়ে আড্ডা দেওয়ার অভ্যাস ছিল আমার। সম্প্রতি এক আড্ডায় বন্ধুদের একজন জিজ্ঞাসা করল, ‘প্রথম আলো কবে ছাড়ছিস?’ বলেছিলাম, ‘প্রথম আলোর চেয়ে ভালো পত্রিকা পেলেই ছেড়ে দেব।’ আমি জেনেছি, সেই দিন জীবনেও আসবে না।

বেতন, স্নেহ, বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, পুরস্কার—কী পাইনি এখান থেকে! আমার বাবা এখন গুরুতর অসুস্থ। পাশে পেয়েছি ‘প্রথম আলো’কে। ‘প্রথম আলো’ আমার জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে আছে।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, প্রথম আলো